নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (عليه السلام) এঁর জীবন কাহিনি-১ম পর্ব [1-3]
হযরত ফাতিমার শৈশবকাল
★১. সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল (ﷺ) ও বেহেশতী নারী হযরত খাদীজার গৃহে হযরত ফাতিমা জন্মগ্রহণ করলেন। সবচেয়ে সম্মানিত গৃহ।অথচ পার্থিব দিক থেকে খুব কষ্টকর একটি গৃহে তিঁনি জন্ম নিলেন।যখন হযরত খাদীজার সাথে রাসূলের বিয়ে হয় তখন হযরত খাদীজা ছিলেন আরবের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব। কিন্তু অসহায় মানুষদের সেবা ও নিপীড়িত মুসলমানদের পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে তিঁনি শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হন।
★ধর্ম প্রচারের কারণে রাসূলের ওপর কুরাইশরা নানাভাবে নির্যাতন শুরু করে। এভাবে হযরত ফাতিমার দুই বছর অতিক্রান্ত হয়।হযরত ফাতিমার জন্মের মাত্র দুই বছর পর তাঁরা সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েন।বনু হাশিমের সাথে কুরাইশরা সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়।তখন বনু হাশিমের নেতা ছিলেন হযরত আবু তালিব।তিনি বনু হাশিমকে নিয়ে শেবে আবি তালিবে (আবু তালিবের গিরিগুহা) আশ্রয় নেন।
★দিনের পর দিন তাঁদেরকে না খেয়ে থাকতে হত।এতে মহিলাদের বুকের দুধ শুকিয়ে যায়।সন্তানরা দুধ না পেয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে যেত।হযরত ফাতিমা শিশু বয়সেই এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়েন। দীর্ঘ তিন বছর তাঁরা এ অবস্থার মধ্যে কাটান।অবশেষে তিন বছর পর তাঁরা এ অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসেন।কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এতো কষ্ট সহ্য করার পর সেই বছরই হযরত ফাতিমার প্রাণপ্রিয় মা ইন্তেকাল করেন।যে বয়সে তাঁর মাতৃস্নেহের প্রয়োজন,যে বয়সে তাঁর লালিত-পালিত হওয়ার কথা সে বয়সেই তাঁর ওপর রাসূলের দেখাশুনার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে।তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ।তিঁনি রাসূলকে মায়ের মতোই যত্ন করতেন, তাঁর দিকে খেয়াল রাখতেন।শুধু ঘরের মধ্যে নয়,ঘরের বাইরেও তিঁনি রাসূলের বিষয়াদির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন।অন্যান্য শিশুর মতো তিনি খেলাধুলা করতেন না।সেই ছোট বেলাতেই তিঁনি একজন দায়িত্বশীল নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।যখনই তিঁনি জেনেছেন যে, কাফির-মুশরিকরা রাসূলকে নির্যাতন করছে,তখনই তিনি সেখানে ছুটে গেছেন এবং পিতাকে উদ্ধার করে এনেছেন। একবার আবু জেহেল ও তার সঙ্গীরা রাসূলের সিজদাবনত অবস্থায় মাথার ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয়।যখন হযরত ফাতিমা এ ঘটনার কথা শোনেন তখনই তিঁনি দৌড়ে সেখানে চলে যান এবং পিতার মাথার ওপর থেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলেন।তিনি আবু জেহেলকে এজন্য তিরস্কার করতে থাকেন।তিনি রাসূলের প্রতি এতটাই যত্নশীল ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে ‘উম্মু আবিহা’ (তার পিতার মা) বলে আখ্যায়িত করেন।
[উসদুল গাবাহ,৫ম খণ্ড,পৃঃ ৫২০]
খন্দকের যুদ্ধের পূর্বে রাসূল ﷺ একদিন পরিখা খননের কাজে ব্যস্ত ছিলেন,হযরত ফাতিমা একটি রুটি তাঁর জন্য নিয়ে আসেন।রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করেন,এটি কি? ফাতিমা বলেন, সন্তানদের জন্য কয়েকটি রুটি বানিয়েছিলাম।সেখান থেকে একটি আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।রাসূল বলেন, হে ফাতিমা! এটাই প্রথম খাদ্য যা তিন দিন পর তোঁমার পিতার নিকট পৌঁছেছে।তিঁনি তাঁর ছোট ছোট সন্তানদের ওপরও রাসূলকে প্রাধান্য দিতেন।প্রতিবেশীরা খাবার পাঠালে তিনি রাসূলকে সঙ্গে না নিয়ে তাদরেকে সে খাবার খেতে দিতেন না।এভাবে রাসূলের ওফাত পর্যন্ত আমরা তাঁকে একজন মমতাময়ী মায়ের ভূমিকায় পাই যিনি সত্যিই ‘উম্মু আবিহা’(স্বীয় পিতার মাতা-এ উপাধি তিনি পিতার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা পালনের কারণে পেয়েছিলেন।কারণ রাসূল (ﷺ) যখনই তাঁর নিকট আসতেন যেন মাতার সান্নিধ্য পেতেন ও তাঁর সকল কষ্ট দূরীভু’ত হত। রাসূল (ﷺ) এঁর ওপর ইসলাম প্রচারের যে গুরু দায়িত্ব ছিল ও এ পথে যত চাপ অনুভব করতেন ফাতিমার মাতৃস্নেহে রাসূল (ﷺ) তা ভুলে যেতেন।বিশেষত হযরত আবু তালিব ও খাদীজার মৃত্যুর পর রাসূলের একাকিত্বে তিনি ছিলেন তাঁর পিতার সবচেয়ে বড় মানসিক প্রশান্তি।
★২. হযরত ফাতিমা (রাঃ) এর বাল্য জীবনের আর একটি স্মরণীয় হৃদয় বিদারক ঘটনা আমাদের সবার হৃদয়কে স্পর্শ করে।ইতিহাসে এই বছরকে বলা হয় আম্বল হুযন বা শোকের বছর।রাসূলে পাক (ﷺ) কাবাশরীফে নামায আদায় করছিলেন এমন সময় একদল খোদাদ্রোহী কুরাইশ অদূরে দন্ডায়মান হয়ে হযরত (ﷺ) কে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ ও উপহাস করছে।প্রিয় নবী (ﷺ) নামাযরত অবস্থায় সেজদায় গেলেন এমনি সময় নরপিশাচ খোদাদ্রোহী কুরাইশরা একটি উটের পচাঁ নাড়িভূড়ি এনে সিজদারত রাসূল (ﷺ) এঁর ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিল।
★উকরাহ বিন আবু মুঈত নামে এক নরাধমের নেতেৃত্বে এ গর্হিত কাজটি করা হয়।শিশু ফাতেমার কানে এ কথা পৌঁছতেই তিঁনি পাগলের মত কাবা ঘরে ছুটে এলেন এবং কারো পরওয়া না করে পিতার গর্দান থেকে ময়লা সরিয়ে ফেললেন।কাফিররা এ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল আর হাতে তালি দিচ্ছিল। ৮/৯ বছর বয়সের ফাতিমা (রাঃ) এ দৃশ্য দেখে কাফিরদের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,হতভাগারা! আহকামুল হাকীমিন তোমাদের অপকর্মের অবশ্যই শাস্তি দিবেন।
[আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ ৩/৪৪, হায়াত আমসাহাবাঃ ১/২৭]
★ইতিহাস থেকে জানা যায়,বদরের যুদ্ধে এই নরপিশাচগুলো মুসলমানদের হাতে অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করে।
রাসূল (ﷺ) নামাজ শেষ করে দু’হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন হে আল্লাহ! তুমি শায়রা ইবনে রাবিয়াকে পাকড়াও কর,হে আল্লাহ তুমি উকবা ইবনে আবী মুঈতকে সামাল দাও হে আল্লাহ তুমি উমাইয়া ইবন খালাফের খবর নাও।হে আল্লাহ! তুমি জাহল ইবনে হিসামকে ধর।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে হাত উঠিয়ে এভাবে দু’আ করতে দেখে পাষন্ডদের হাসি থেমে যায়।তারা ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।আল্লাহ তার প্রিয় নবীর কথা কবুল করেন। উল্লেখিত চার দুর্বৃত্তের সবাই বদরে নিহত হন।
[আল বায়হাকী,দালাযিল আননবুয়াহঃ ২/২৭৮,২৮০,আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৪৪]
উল্লেখ্য যে,উকবা বদরে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন।রাসূল (ﷺ) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন।তখন সে বলে মুহাম্মদ! আমার ছোট্ট মেয়েগুলোর জন্য কে থাকবে? জাহান্নাম! তারপর সে বলে, আমি কুরাইশ হওয়াও সত্বেও আমাকে তুমি হত্যা করবে? বললেন,হ্যাঁ।তারপর নবী (ﷺ) সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান এই লোকটি আঁমার সাথে কিরূপ আচরণ করেছিল? একদিন আঁমি মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে সিজদারত ছিলাম।এমন সময় সে এসে আঁমার ঘাড়ের উপর পা উঠিয়ে এত জোরে চাপ দেয় যে, আঁমার চোখ দুটি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আরেকবার আঁমি সিজদায় আছি এমন সময় সে কোথা থেকে ছাগলের বর্জ্য এনে আঁমার মাথায় ঢেলে দেয়।ফাতেমা দৌড়ে এসে তা সরিয়ে আঁমার মাথা ধুইয়ে দেয়। এভাবে মুসলমানদের হাতে পাপিষ্ঠ উকবার জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
[আল বিদায়া ওয়ান নিছায়াঃ ৩/৪৪, হায়াত আমসাহাবাঃ ১/২৭১,মুবাশশরাত বিন জান্নাহঃ ২০৫]
⏹আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহর কাছে নামায আদায় করছিলেন।সেখানে আবু জেহেল ও তার সঙ্গীরা বসা ছিল।গতদিন উট জবাই করা হয়েছিল।এমন সময় আবু জেহেল বলে উঠল, ‘তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়ীভুঁড়ি এনে মুহাম্মদ যখন সিজদা করবে তখন তার পিঠের উপর রাখতে পারবে?
**তখন কওমের সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোকটি দ্রুত গিয়ে উটনীর নাড়ী ভুঁড়ি নিয়ে এল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন তখন এগুলো তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে রেখে দিল।বর্ণনাকারী বলেন: তারা নিজেরা হাসতে থাকলো; হাসতে হাসতে একে অন্যের ওপর হেলে পড়ল।আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। হায়! আমার যদি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকত তাহলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠ মোবারক থেকে এগুলো ফেলে দিতাম।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় পড়ে থাকলেন; মাথা মোবারক উঠালেন না।এক পর্যায়ে এক লোক গিয়ে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কে খবর দিলেন। খবর শুনে তিঁনি ছুটে এলেন।সে সময় ফাতেমা (রাঃ) ছিলেন ছোট বালিকা। তিঁনি এসে উটের নাড়ীভুঁড়ি তাঁর পিঠ মোবারক থেকে ফেলে দিলেন।
**এরপর লোকদের দিকে মুখ করে তাদেরকে গালমন্দ করলেন।অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁর নামায শেষ করলেন তখন তিঁনি কণ্ঠস্বর উঁচু করলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করলেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দোয়া করতেন তখন তিনবার করতেন এবং যখন প্রার্থনা করতেন তখন তিনবার করতেন-এরপর বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আঁপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন।এভাবে তিনবার বললেন।তারা যখন তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল তাদের হাসি মিলিয়ে গেল এবং তারা তাঁর বদ দোয়াকে ভয় পেল।
**এরপর তিঁনি বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! আবূ জেহেল ইবনে হিশাম,‘উতবা ইবনে রাবী’আ, শায়বা ইবনে রবী’আ,ওয়ালীদ ইবনে ‘উকবা,উমাইয়্যা ইবনে খালাফ ও ‘উকবা ইবনে আবু মু’আইতকে ধ্বংস করুন।রাবী বলেন,তিঁনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন কিন্তু আমি স্মরণ রাখতে পারিনি।
**সেই সত্তার কসম! যিঁনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন,আমি বদর যুদ্ধের দিন তাদেরকে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।পরবর্তীতে তাদেরকে টেনেহিঁচড়ে বদরের কূপের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়।”
[সহিহ বুখারী ২৪০,সহিহ মুসলিম,১৭৯৪]
★এর পরের ঘটনা দেখে বালিকা ফাতিমার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ভয়ে অসার হয়ে পড়েন। দেখেন তাদের একজন তার পিতার গায়ের চাদরটি তার গলায় পেঁচিয়ে জোরে টানতে শুরু করেছে। আর আবু বকর (রাঃ) তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত কন্ঠে কলছেন! তোমরা একটি লোককে শুধু এজন্য হত্যা করবে যে, তিনি বলেন! আল্লাহ আমার রব, প্রতিপালক?
লোকগুলো আগুনঝরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। তার দাড়ি ধরে টানলো, তারপর মাথা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ছাড়লো।
[ইবনে হিসান,আল সীরাহ আল নাবাজিয়াহ্ ১-৩১০]
★এভাবে আবু বকর (রাঃ) সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে পাষন্ডদের হাত থেকে মুহাম্মদ (ﷺ) কে ছাড়ালেন। ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়ীর পথ ধরলেন।মেয়ে ফাতিমা পিছনে পিছনে চললেন। পথে স্বাধীন ও দাস যাদের সাথে দেখা হলো প্রত্যেকেই নানরকম অশালীন মন্তব্য ছুঁড়ে মেরে ভীষণ কষ্ট দিল।রাসূল (ﷺ) সোজা বাড়ীতে গেলেন এবং মারাত্মক রকম বিধ্বস্ত অবস্থায় বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। বালিকা ফাতিমা (রাঃ) এর চোখের সামনে এ ঘটনা ঘটল।
[তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়ত আন-নবুয়াহ্ ৫৯২] ★★সংক্ষিপ্ত★★
★৩. হযরত ফাতিমা (আ:) এঁর জীবন- যাপন প্রণালীঃ
★বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ ‘সুনানে ইবনে দাউদ’ এর রচয়িতা আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে তিয়ালসী তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন, হজরত আলী ইবনে আবি তালিব বলেছেন, তোমরা কি চাও না যে, নিজের ও নবি কন্যা ফাতেমা সম্পর্কে তোমাদেরকে অবগত করি? তিনি মহানবি ﷺ-এঁর সবচেয়ে নিকটতম হওয়া সত্ত্বেও আমার বাড়ীতে যাতা পিষতে পিষতে তার হাতে ক্ষতের সৃষ্টি হত,পানি বহনের কারণে তার কাঁধে ব্যথা হত,ঝাড়ু দান ও গৃহ পরিচ্ছন্ন করার কারণে তার পোষাক পুরোনো হয়ে যেত।শুনেছি যে,মহানবি ﷺ -এঁর নিকট কয়েকজন গৃহ পরিচারিকা ছিলেন (দাসী)।ফাতেমা সাহায্য গ্রহণের আশায় বাবার কাছে গেলেন।যাতে ঐ গৃহ পরিচারিকাদের একজনকে বাড়ীর কাজের জন্য তাঁর (ﷺ) নিকট চাইতে পারেন।কিন্তু তিঁনি বাবার নিকট উপস্থিত হয়ে সেথায় উপস্থিত যুবকদেরকে দেখে অতিমাত্রায় লজ্জিত হয়ে নিজের আবেদন প্রকাশ করা হতে বিরত থাকলেন এবং মনের কথা না বলেই তিঁনি ফিরে আসলেন।
[সুনানে আবি দাউদ, ২য় খণ্ড,পৃষ্ঠা ৩৩৪]
⏺যুহ্দ বা দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ততা:
ইমাম জা’ফর আস সাদেক (আঃ) এবং হযরত জাবের আনসারী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,একদিন হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) হযরত ফাতেমাকে দেখলেন যে,তিনি একটি মোটা ও শক্ত কাপড় পরিধান করে নিজ হস্তে যাঁতাকল চালিয়ে আটা তৈরী করছেন।আর সে অবস্থায় নিজের কোলের সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছেন।এহেন অবস্থা পরিদর্শনে হযরতের চোখে পানি ছল ছল করে উঠলো।তখন তিনি বলেন : “আঁমার হে প্রিয় কন্যা! এ দুনিয়ার তিক্ততা আখেরাতের মিষ্টি স্বাদেরই পূর্ব প্রস্তুতি মনে করে সহ্য করে যাও।”
প্রত্যুত্তরে হযরত ফাতেমা বলেন:
হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহ্ প্রদত্ত এতসব নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এবং এ জন্যে তাঁর অশেষ প্রশংসাও করছি।তখন আল্লাহ্ নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন :
وَ لَسَوْفَ يُعْطِيْكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
অর্থাৎ তোমার প্রভু অতি শীঘ্রই তোমাকে এতসব কিছু দেবেন যার ফলে তুমি সন্তুষ্ট হবে।”
[আদ দোহা,আয়াত নং ৫]
ইমাম জা’ফর সাদিক (আ:) বলেন : “ইমাম আলী (আ:) পানি ও কাঠ জোগাড় করে আনতেন আর হযরত ফাতেমা (আ:) আটা তৈরী করে খামির বানাতেন আর তা দিয়ে রুটি তৈরী করতেন।তিঁনি কাপড়ে তালি লাগানোর কাজও করতেন।এ মহিয়সী রমণী সকলের চেয়ে বেশী রূপসী ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র গাল দু’টি সৌন্দর্যে পুষ্পের ন্যায় ফুটে ছিল। আল্লাহর দরূদ তিনি সহ তাঁর পিতা,স্বামী ও সন্তানদের উপর বর্ষিত হোক।”
[রাওদ্বাহ্ আল কাফি,পৃ: ১৬৫,ইসলামিয়া প্রেস,তেহরান থেকে প্রকাশিত।]
হযরত আলী (আ:) বলেছেন: “ফাতেমা মশক দিয়ে এতই পানি উত্তোলন করেছেন যার ফলে তাঁর বক্ষে ক্ষতের ছাপ পড়ে যায়,তিঁনি হস্তচালিত যাতাকলের মাধ্যমে এত পরিমান আটা তৈরী করেছেন যার কারণে তাঁর হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়,তিঁনি এত পরিমান ঘর রান্না-বান্নার কাজ করেছেন যে তাঁর পোশাক ধুলি ধোঁয়া মাখা হয়ে যেত।এ ব্যাপারে তিঁনি প্রচুর কষ্ট স্বীকার করেছেন।”
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ৪২, ৮২; বাইতুল আহযান,পৃ: ২৩]
★উল্লেখ্য যে তিনি মদীনার দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রতিদিনই রুটি প্রস্তুত করতেন।হযরত ফাতিমা খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন।সংসারের যাবতীয় কাজ তিনি নিজের হাতে করতেন। তাঁর কাজে সাহায্যের জন্য কোন দাস-দাসী ছিল না। মশক দিয়ে পানি উত্তোলনের ফলে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গিয়েছিল।তিঁনি যাঁতার মাধ্যমে এত পরিমাণ আটা তৈরি করতেন যে,তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। আর তিনি সেই আটা দিয়ে রুটি তৈরি করে মদীনার দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করতেন।হযরত ফাতিমা কাপড়ে তালি লাগিয়ে সেই কাপড় পরিধান করতেন। পার্থিব কোন বস্তুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারত না। আর এজন্যই রাসূল (ﷺ) তাঁকে ‘বাতুল’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
★৪. মদীনায় হিজরতঃ ইসলাম প্রচারের ত্রয়োদশ বর্ষে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ) মহান আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন।তাঁর হিজরত করার সময় হযরত ফাতিমা মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন।কয়েকদিন পর হযরত আলী (আ:) হযরত ফাতিমা ও বনু হাশিমের আরও কয়েকজন নারীসহ হিজরত করেন।
✊✊✊বিয়ে ও মোহরানা✊✊✊
★৫. হযরত রাসূলে আকরাম (ﷺ) এঁর পরিবারবর্গ যখন মদিনায় গমন করেন, তখন ফাতিমা (রাঃ) ছিলেন অবিবাহিতা। আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) মত উচু মর্যাদার অধিকারী সাহাবাগণও ফাতিমা (রাঃ) কে স্ত্রী হিসাবে পেতে আগ্রহী ছিলেন এবং তারা রাসূল (ﷺ) এঁর নিকট প্রস্তাবও দেন।কিন্তু তিনি অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সাথে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। [তাবাকাত ৮/১১;নিসা মুবাশসারাত বিল জান্নাহ ২০৮]
★তিনি আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় ছিলেন,এখন আলী (রাঃ) বাকী রয়েছে। সেতো রাসূল (ﷺ) এঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করা অত্যন্ত প্রিয় এবং চাচাতো ভাই।এ অবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবী ও মহিলারা হযরত আলীকে এই বিয়ের প্রস্তাবের ব্যাপারে পরামর্শ দিলেন। পরামর্শের পর তারা মহান ব্যক্তি আলী (রাঃ) কে খুঁজতে বের হলেন,তিনি তখন জঙ্গলে উট চরাচ্ছিলেন।তারা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলীকে ফাতিমার জন্য পয়গাম প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করলেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এঁর নিকট এ প্রস্তাব পেশ করলে,তিনি আলীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন তোমার কাছে মোহর আদায় করার মত কিছু আছে কি? আলী (রাঃ) না সূচক জবাব দিলেন।পুনরায় রাসূল (ﷺ) বললেন,তোমার লৌহবর্ম কোথায়? সেই লৌহবর্ম দিয়ে মোহর আদায় কর।
[নাসাঈ,হাকিম,আবু দাউদ হা/২১২৫, বুলগুল মারাম হা/৯৬৮ মোহর অনুচ্ছেদ বিবাহ অধ্যায়]
✊মোহরানার অর্থ সংগ্রহে হযরত আলী (রাঃ) স্বীয় বর্মটি বাজারে বিক্রী করতে গেলেন।পথে দেখা হলো হযরত ওসমান (রাঃ) এর সাথে।সব কিছু শুনে তিনি সেটি কিনে নিলেন ৪৮০ দিরহামে।তিনি সদ্য কেনা বর্মটি তাঁরই হাতে তুলে দিয়ে বললেন,আমাকে নয় এ বর্ম একজন বীরের অঙ্গেই শোভা পায়।কাজেই এটি আমি তোমাকেই উপহার দিলাম।আলী (রাঃ) দিরহাম ও বর্ম দুই-ই পেশ করলেন হযরত এর সামনে।হযরত রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দু-হাত তুলে আল্লাহর দরবারে হযরত ওসমান (রাঃ) এর জন্য দোয়া করলেন।
★হযরত রাসূল করিম (ﷺ) স্বয়ং কন্যার মতামত জানতে চাইলে লাজ কুন্ঠিতা স্বল্পভাষিনী কন্যা আনত মন্তকে নিরুত্তর। নারীদের এই নীরবতাকেই সম্মতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়অতঃপর রাসূলূল্লাহ (ﷺ) আনাস (রাঃ),আবু বকর (রাঃ),ওমর (রাঃ),আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) ও অন্যান্য মুহাযির ও আনসারগণকে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন।সকলে উপস্থিত হওয়ার পর রাসূল (ﷺ) বিয়ের খুতবা পাঠ করলেন এবং আলীকে বললেন “আমার কন্যা ফাতিমাকে তোমার সাথে ৪০০ মিসকাল রৌপ্যের বিনিময়ে বিয়ে দিলাম, তুমি কি তা কবুল করছো?।আলী (রাঃ) বললেন জি,কবুল করলাম।তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিম্নোক্ত দোয়া পড়লেন।‘হে আল্লাহ তাদের উভয়ের মাঝে বরকত দান করুন,তাদের উপর কল্যাণ দান করুন এবং তাদের বংশে বরকত দান করুন’ রাসূল (ﷺ) এর খুতবার পর তৎকালীন আরবের প্রথানুযায়ী বর আলী (রাঃ) কে ছোট্ট একটি খুতবা দিতে বলেন। অতঃপর উপস্থিত অতিথিবৃন্দ এবং সাহাবায় কেরামের মধ্যে খুরমা ভর্তি একটি পাত্র উপস্থাপন করা হয়। [তাবাকাত ইবনে সাদ-৮/২৫৩ পৃষ্ঠা, আ’লামুন নিসা, ৪/১০৯ পৃষ্ঠা]
অতঃপর রাসূল (ﷺ) ফাতিমার নিকট গমন করলেন এবং তাকে ডাকলে তিনি লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পিতার নিকট আসলেন।রাসূল (ﷺ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ফাতিমা! আমার বংশের উত্তম ব্যক্তির সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছি।
[নিয়াম ফতেপুরি অনুবাদ,গোলাম সোবাহান সিদ্দিকি মহিলা সাহাবী,ঢাকা আলফালাহ পাবলিকেশন ১৯৮৭/১৪০৭ পৃষ্ঠা ১৫৫]
ফাতিমা (রাঃ) এর বিয়ের সময়কাল সম্পর্কে কিছু মতভেদ রয়েছে।কারো মতে তার বিয়ে হয়েছিল দ্বিতীয় হিযরীর জিলকদ মাসে বদর যুদ্ধের পর,তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর ০৫ মাস ১৫ দিন।
★তাহ্যীবু তাহযীব: ১২/৩৯১ পৃষ্ঠা
★সিয়ারু আ’লাম আন নুবালা: ২/১১৯ পৃষ্ঠা
★আন আ’লামুন নিসা,৪/১০৯ পৃষ্ঠা।
আলী (রাঃ) এর বয়স তখন ২১ বছর ০৫ মাস।
[আ’লাম আন-নিসা: ৪/১০৯]
উপঢৌকন
★৬. বিয়ের সময় রাসূল (ﷺ) ফাতিমা (রাঃ) কে যে সমস্ত আসবাবপত্র উপঢৌকন স্বরূপ প্রদান করেছিলেন তা ছিল একটি নকসা করা খাট,উল ভরা মিশরী কাপড়ে প্রস্তুত করা বিছানা,দুটি চাদর,খেজুরের ছাল ভর্তি চামড়ার বালিস,পানির জন্য দুটি পাত্র,একটি জাঁতা,একটি পিয়ালা,একটি মশক ইত্যাদি।
[আল বিদায়া অননিহায়া ৯/৪৯৬ পৃষ্ঠা]
ওয়ালীমা
★৭. বিয়ের পর রাসূল (ﷺ) আলীকে ওয়ালীমার ব্যবস্থা করতে বলেন।ফলে অল্প অর্থের বিনিময়ে তিনি ওয়ালীমার ব্যবস্থা করেন।এতে পনীর,খেজুর,জবের নান,এবং গোস্ত ছিল।হযরত আছমা (রাঃ) বলেন, তৎকালীন যুগে এটা ছিল সর্বোত্তম ওয়ালীমা।
[ত্বাবাক্বাত ইবনে সাদ ৮/২৫৪ পৃষ্ঠা]
বিয়ের পোশাক
★৮. হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) হযরত ফাতেমার বিয়ের রাত্রির জন্যে একটি পোশাকের ব্যবস্থা করেন।কেননা হযরত ফাতেমার পরনের পোশাকে তালি দেয়া ছিল।এমন সময় একজন ভিক্ষুক দ্বারে কড়া নাড়ে।ভিক্ষুকটি পরিধানের জন্যে একখানা বস্ত্র প্রার্থনা করে।হযরত ফাতেমা তাঁর পরনের তালি দেয়া কাপড়টি দান করতে মনস্থ করলে মনে পড়ে যায় যে আল্লাহ্ বলেছেন :
لَنْ تَنَالُوْا اْلْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ
অর্থাৎ তোমরা যা ভালবাস তা থেকে দান না করা পর্যন্ত কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না।
[সূরা আল ইমরান: আয়াত নং ৯২]
☝আর এ জন্যেই হযরত ফাতেমা তাঁর বিয়ের নতুন পোশাক ভিক্ষুককে দান করে দেন।
[রায়াহিনুশ শারিয়াহ্,১ম খণ্ড,পৃ: ১০৬; তাবারুল মুযাব’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত]
নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (عليه السلام) এঁর জীবন কাহিনি- ২য় পর্ব
সংসার জীবন
★৯. কন্যাকে বিদায় দিতে এগিয়ে এলেন স্নেহময় পিতা।দেখলেন মেয়ে কাঁদছেন! তার মনে হলো হয়তো স্বামীর দারিদ্রের কথা ভেবেই মেয়ে কাঁদছেন।তিনি তাকে সান্তনা দিতে গেলেন এই বলে যে,পার্থিব সুখ দুঃখ ক্ষণস্থায়ী।পরকালীন আনন্দ বেদনাই চিরস্থায়ী।আলী (রাঃ) দরিদ্র হতে পারে,কিন্তু তার চেয়ে অধিকতর যোগ্য পাত্র আর কেউ নেই।ক্রন্দনময়ী ফাতিমা (রাঃ) জানালেন আলী (রাঃ) এর দরিদ্রতা নয়,জীবনে এই প্রথম পিতার নৈকট্য ও ছত্রছায়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন আর এমন দিনে মা ও কাছে নেই,তাই এ কান্না। পলকে প্রিয়তমা মা খাদিযাতুল কুবরা (রাঃ) এর স্থিতি মানসপটে ভেসে উঠে। এতদিন ফাতিমা (রাঃ) ছায়ার মতো বাবার সাথে ছিলেন।প্রতি মুহূর্তে সেবা পরিচর্যায় পুর্ণ করেছেন তার শূন্য দিনগুলো।তিনি আজ চলে যাচ্ছেন স্বামীর বাড়ী।চোখ দুটো পানিতে ভিজে যায় রাসূল (ﷺ) ও কোন রকমে অশ্রু সংবরণ করে তিনি আলী (রাঃ) কে বললেন ‘হে আলী, ফাতিমা তোমার সৌভাগ্যের কারণ হউক, আর ফাতিমা (রাঃ) কেও বললেন সংসারের সব কাজ নিজ হাতে করবে,সব সময় স্বামীর দিকে নজর দিবে,তার খেদমতে নিজকে সঁপে দিবে’।
★আলী (রাঃ) যে বাড়ীতে ফাতিমা (রাঃ) কে নিয়ে বসবাস করতেন,সে বাড়ীটি রাসূল (ﷺ) এর বাড়ী হতে বেশ কিছু দূরে ছিল।তথাপিও রাসূল (ﷺ) প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখতে যেতেন।একদিন রাসূল (ﷺ) তাকে বললেন,‘মা! প্রায়ই তোমাকে দেখতে আসতে হয় তোমাকে আমি কাছে নিয়ে যেতে চাই, ফাতিমা (রাঃ) বললেন,আব্বাজান! হারিছা বিন নোমানের অনেক বাড়ী আছে তাকে বলুন একটি বাড়ী খালি করে দিতে,রাসূল (ﷺ) বললেন,বেটি আমার! হারিছার নিকট বাড়ী চাইতে আমার লজ্জা হয়।কেননা সে প্রথমেই আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ) এঁর সন্তুষ্টির জন্য কয়েকটি বাড়ী দান করেছেন,এ কথা শুনে ফাতিমা (রাঃ) চুপ হয়ে গেলেন।কিন্তু হারিছা বিন নোমানের কানে এ বিষয়ে কথা পৌছলে তিনি রাসূল (ﷺ) এর নিকট এসে বললেন,‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমি জানতে পেরেছি যে,আঁপনি আঁপনার প্রিয়তমা কন্যাকে আঁপনার সন্নিকটে রাখতে চান। আমি আমার সকল বাড়ী আঁপনার নিকট হস্তান্তর করে দিলাম।অনুগ্রহ করে ফাতিমা (রাঃ) কে ডেকে পাঠান।তিনি যে বাড়ীতে ইচ্ছা সেই বাড়ীতে বসবাস করতে পারেন।আমার জীবন ও সম্পদ আপনার জন্য কুরবান হোক।আল্লাহর কসম! যে জিনিস আমার নিকট থেকে নিবেন তা আমার নিকটে থাকার চেয়ে আপনার নিকটে থাকায় আমি বেশী পছন্দ করি। রাসূল (ﷺ) বললেন,আল্লাহপাক তোমার সম্পদে প্রাচুর্য্যতা দান করুন।অতঃপর আলী (রাঃ) ও ফাতিমা (রাঃ) কে হারিছা বিন নোমানের একটি বাড়ীতে নিয়ে এলেন।
[প্রাগুপ্ত আঃলামুন নিসা ৪/১১০ পৃষ্ঠা]
★১০. একদা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ফাতিমা (রাঃ) এর গৃহে গিয়ে দেখেন তিনি উটের চামড়ার পোশাক পরে আছেন,তাতে আবার তেরটি পট্টি লাগানো।তিনি আটা পিষছেন ও মুখে আল্লাহর কালাম উচ্চারণ করছেন।রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এ দৃশ্য দেখে বললেন,ফাতিমা! সবরের মাধ্যমে দুনিয়ার কষ্ট শেষ করো এবং আখেরাতের স্থায়ী শান্তির অপেক্ষা কর।আল্লাহ তোমাকে নেক পুরস্কার দিবেন।
[মহিলা সাহাবী তালিবুল হাসেমী পৃষ্ঠা ১০৩]
★১১. একদিন আলী (রাঃ) ঘরে ফিরে কিছু খাবার চাইলেন।ফাতেমা (রাঃ) বললেন অভুক্ত অবস্থায় আজ তৃতীয় দিন চলছে।জবের একটি দানাও ঘরে নেই। আলী (রাঃ) বললেন,হে ফাতিমা! আমাকে তুমি বলনি কেন? তিনি জবাবে বললেন, হে আমার স্বামী! রুখসতের সময় আব্বাজান নছিহত করে বলেছিন যে, আমি যেন কোন কিছুর চেয়ে আপনাকে লজ্জিত না করি।
[মহিলা সাহাবী তালিবুল হাসেমী পৃষ্ঠা নং ১০৪]
★১২. ফাতিমা (রাঃ) স্বামীর গৃহের কাজ সব সময় নিজ হাতে করতেন।তার কোন দাস দাসী ছিল না।একদিন আলী (রাঃ) তাকে বললেন,ফাতিমা! যাতা পিষতে পিষতে তোমার হাতে ফোসকা পড়ে গেছে।আর ঘর ঝাড়া মোছা করতে করতে তোমার কাপড় ময়লা হয়ে গেছে,মশক ভরে পানি আনতে আনতে কোমর ও সিনায় ব্যথা হয়ে গেছে এবং উনুন জ্বালাতে জ্বালাতে তোমার চেহারা মলিন হয়ে গেছে।তোমার আব্বার নিকট আজ গনিমতের অনেক দাসী এসেছে।তার নিকট গিয়ে একটি দাসী চেয়ে নিয়ে আস। ফাতিমা রাসূল (ﷺ) এঁর নিকট উপস্থিত হলেন,কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতে পারলেন না।কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তিনি ফিরে এলেন এবং আলী (রাঃ) কে বললেন, আব্বার নিকট কোন দাসী চাওয়ার সাহস আমার হয়নি।এর পর স্বামী-স্ত্রী উভয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকটে হাজির হয়ে একটি দাসী প্রাপ্তির আবেদন জানালেন। রাসূল (ﷺ) উত্তরে বললেন,আমি কোন দাসীকে তোমাদের খেদমতে দিতে পারছি নে।কেননা আসহাবে ছুফফার খাওয়া ও শিক্ষা-দীক্ষার সুষ্ঠু ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে।আমি তাদেকে কিভাবে ভুলে যেতে পারি যারা নিজেদের বাড়ী ঘর আত্মীয় স্বজনদের ছেড়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য দারিদ্র ও বুভূক্ষ জীবন গ্রহণ করেছে।
★জবাব শুনে স্বামী-স্ত্রী উভই চুপচাপ ঘরে ফিরে এলেন।রাতে রাসূল (ﷺ) তাদের নিকট আগমন করলেন এবং কোমল সুরে বললেনঃ তোমরা আমার কাছে যা চেয়েছিলে তার চেয়ে উত্তম কিছু কি আমি তোমাদেরকে বলে দিব? তারা দুজনেই একসাথে বলে উঠলেন বলুন,ইয়া রাসূলাল্লাহ!
★তিনি বললেনঃ জিবরীল (আঃ) আমাকে এই কথাগুলি শিখেয়েছেনঃ প্রত্যের নামাজের পরে তোমরা দুজন দশবার সুবহানাল্লাহ,দশ বার আলহামদুলিল্লাহ ও দশবার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে।আর রাতে যখন বিছানায় ঘুমাতে যাবে তখন সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ্ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৪ বার পাঠ করবে।এ আমল তোমাদের জন্য উত্তম খাদেম হিসাবে গণ্য হবে।
দলিল
*(ক.) সহীহ্ বুখারী: হা/৩১১৩,৩৭০৫, ৫৩৬১,৫৩৬২,৬৩১৮।
*(খ.) সহীহ্ মুসলিম: হা/২৭২৭,২৭২৮
*(গ.) ত্বাবাক্বাত ইবনে সাদ: ৮/২৫৫ পৃষ্ঠা
*(ঘ.) আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৪৮৭ পৃষ্ঠা
✊এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়, আলী (রাঃ) একবার দারুণ অভাব অনটনের মধ্যে পড়লেন। একদিন স্ত্রী ফাতিমা (রাঃ) বললেন, যদি তুমি নবী (ﷺ) এঁর নিকট গিয়ে কিছু চেয়ে আনতে তাহলে ভাল হতো।ফাতিমা (রাঃ) গেলেন তখন নবী (ﷺ) এঁর নিকট উম্মু আয়মন (রাঃ) বসা ছিলেন।ফাতিমা (রাঃ) দরজার টোকা দিলেন।নবী (ﷺ) উম্মু আয়মনকে বললেনঃ নিশ্চিয় এটা ফাতিমার হাতের টোকা।এমন সময় সে আমাদের নিকট এসেছে যখন সে সাধারণতঃ আসতে অভ্যস্ত নয়।ফাতিমা (রাঃ) ঘরে ঢুকে বললেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ! ফেরেস্তাদের খাদ্য হলো তাসবীহ তাহলীল্ ও তাহ্মীদ।কিন্তু আমাদের খাবার কি? তিনি বললেনঃ সেই সত্ত্বার শপথ যিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, মুহাম্মাদের পরিবারের রান্না ঘরে ত্রিশ দিন যাবৎ আগুন জ্বলে না।আমার নিকট কিছু ছাগল এসেছে,তুমি চাইলে পাঁচটি ছাগল তোমাকে দিতে পারি।আর তুমি যদি চাও এর পরিবর্তে আমি তোমাকে পাঁচটি কথা শিখিয়ে দিতে পারি যা জিবরীল (আঃ) আমাকে শিখিয়েছেন।ফাতিমা (রাঃ) বললেন,আপনি বরং আমাকে সেই পাঁচটি কথা শিখিয়ে দিন যা জিবরীল (আঃ) আপনাকে শিখিয়েছে।নবী (ﷺ) বললেন, বলো:
“ইয়া আউয়ালাল আওয়ালীন,ইয়া আখেরেল আখেরিন,ইয়াজাল কুউয়াতিল মাতিন,ইয়া রাহিমাল মাছাকিন, ইয়া আরহামার রাহিমিন”।
★এই পাঁচটি কথা শিখে ফাতিমা (রাঃ) ফিরে গেলেন আলী (রাঃ) এর নিকট। ফাতিমা (রাঃ) কে দেখে আলী (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ খবর কি? ফাতিমা (রাঃ) বললেনঃ “আমি দুনিয়া পাওয়ার প্রত্যশা নিয়ে তোমার নিকট থেকে গিয়েছিলাম,কিন্তু ফিরে এসেছি আখেরাত নিয়ে”।আলী (রাঃ) বললেনঃ ‘আজকের দিনটি তোমার জীবনের সর্বোত্তম দিন’।
★১৩. একদা ফাতিমা (রাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন।রাসূল (ﷺ) সাহাবী ইমরান বিন হুসাইনকে সঙ্গে নিয়ে স্বীয় কন্যার সেবা শুশ্রুষার জন্য গেলেন।বাড়ীর দরজায় গিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন।ফাতিমা (রাঃ) বললেন ভিতরে আসুন আব্বাজান! রাসূল (ﷺ) বললেন,আমার সাথে ইমরান ইবনে হুসাইন রয়েছে।ফাতিমা (রাঃ) জবাব দিলেন আব্বাজান! একমাত্র ‘উবা’ ছাড়া পর্দা করার মতো দ্বিতীয় কোন কাপড় আমার নিকট নেই।রাসূল (ﷺ) তখন নিজের চাদর ভিতরে নিক্ষেপ করে বললেন মা! এ দিয়ে পর্দা কর।অতঃপর রাসূল (ﷺ) ইমরান বিন হুসাইনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাকে বললেন আব্বাজান! কঠিন ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি এবং ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি।কেননা ঘরে কোন খাবার নেই,রাসূল (ﷺ) বললেন হে আমার কলিজার টুকরা! ধৈর্য ধারন কর।আমিও আজ তিন দিন যাবত অনাহারে ক্লিষ্ট হচ্ছি।আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট আমি যা চাই তা তিনি আমাকে দিয়ে থাকেন।কিন্তু আমি আখেরাতকে দুনিয়ার উপর অগ্রাধিকার দিয়েছি।অতঃপর তিনি তার স্নেহ মাখা হাত ফাতিমার পিঠের উপর রেখে বললেন,হে আমার বেটি! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট হবে না যে,তুমি সারা বিশ্বের মহিলাদের নেত্রী! তখন ফাতিমা (রাঃ) বললেন তাহলে মারইয়াম (আঃ) এর অবস্থান কি হবে? রাসূল (ﷺ) বললেন, তিনি হলেন তার আমলে বিশ্বের নেত্রী, আর তুমি হলে তোমার আমলের বিশ্বের মহিলাদের নেত্রী।
[সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা: ২/১২৬ পৃষ্ঠা; আল মুস্তাদরাক আলাস ছহীহাইন ৩/১৭০ পৃষ্ঠা]
⏺বিয়ে পরবর্তী জীবনে রাসূলের সান্নিধ্য ও যুদ্ধক্ষেত্রে সেবিকার ভূমিকায়:
★১৩. বিয়ের পরও হযরত ফাতিমা রাসূলের সেবায় নিয়োজিত থাকতেন।তাঁর ঘর থেকে রাসূলের ঘর বেশি দূর ছিল না। তিনি সবসময় রাসূলের খবর নিতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও একইভাবে হযরত ফাতিমার খোঁজ-খবর নিতেন।প্রতিদিন প্রভাতে মসজিদে যাওয়ার পূর্বে রাসূল (ﷺ) হযরত ফাতিমার সাথে দেখা করতেন।নাফে বর্ণনা করেন,‘আমি আট মাস মদীনায় বসবাস করেছিলাম।তখন প্রতিদিন রাসূল (ﷺ)-কে দেখতাম যখন তিনি ফজর নামায আদায়ের জন্য ঘরের বাইরে আসতেন তখন সর্বপ্রথম ফাতিমার দরজার সন্নিকটে গিয়ে বলতেন :
اَلسَّلامُ عَلَيْكُمْ يَا اَهْلَ الْبَيْتِ وَ رَحْمَةُ اللهِ وَ بَرِكَاتُهُ، اَلصَّلاةُ، ‘
হে আহলে বাইত! তোমাদের প্রতি সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত (বর্ষিত হোক)। নামাযের সময় হয়েছে।হে আহলে বাইত! নিশ্চয়ই আল্লাহ চান তোমাদের থেকে সকল পাপ-পঙ্কিলতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।’
[কাশফুল গুম্মাহ,২য় খণ্ড,পৃঃ ১৩]
★কোন সফরে বা যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূল সবশেষে হযরত ফাতিমার কাছ থেকে বিদায় নিতেন।আবার মদীনায় ফিরে সর্বপ্রথম তিনি হযরত ফাতিমার সাথে সাক্ষাৎ করতেন।
✊হিজরতের প্রথম বছর মোটামুটি নির্বিঘ্নে কাটলেও দ্বিতীয় বছর থেকেই আবার কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।মক্কার কাফির-মুশরিকরা মুসলমানদের সাথে একের পর এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়।প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত হতে থাকে।যুদ্ধের ময়দানেও হযরত ফাতিমা রাসূলের সেবায় নিয়োজিত হন। উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ আহত হলে তিনি যুদ্ধের ময়দানে ছুটে চলে যান।তিনি পিতার মুখমণ্ডল ধুয়ে দেন এবং খেজুরের ডাল ভস্মীভূত করে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন।
সন্তান প্রতিপালনে হযরত ফাতিমাঃ
★১৪. যদি সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে সন্তানরা লালিত- পালিত হয় তাহলে ধর্ম প্রচারের কাজ কতই না সহজ হয়ে যায়! এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হযরত ফাতিমা।হযরত ফাতিমার বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আলী নিশ্চিন্তে হযরত ফাতিমার ওপর সন্তান লালন-পালনের ভার দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এঁর সাথে বেরিয়ে পড়তেন হয়ত কোন সফরে,না হয় কোন যুদ্ধে।আর হযরত ফাতিমা একাকী কত বড় দায়িত্বই না পালন করলেন! তিনি কীভাবে গড়ে তুললেন এ সন্তানদের? রাসূলের দুই নাতি তথা আল্লাহর তলোয়ার আলী মুর্তাজার দুই সন্তানকে তিনি গড়ে তুললেন ‘বেহেশতের যুবকদের নেতা’ রূপে।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,‘হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা।’
[বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত জামে আত-তিরমিযী,৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদীস নং ৩৭২০]
★হ্যাঁ,এ নেতাদের গড়ে তুলেছেন বেহেশতেরই নারীদের নেত্রী হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ)।হযরত ফাতিমা দুইজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব গড়ে তুললেন পরবর্তীকালে ইসলামের জন্য যাঁদের অবদান মুসলমানরা উপলব্ধি করতে পেরেছে।ইমাম হাসান এক মহা সংকটকালে সন্ধির মাধ্যমে ইসলামকে রক্ষা করেন।আর ইমাম হুসাইন ইসলামের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই কারবালার মরুপ্রান্তরে নিজের পরিবার-পরিজনসহ শাহাদাত বরণ করেন।অথচ তাঁরাই হলেন রাসূলের পরিবার-রাসূলের আহলে বাইত পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) যাঁদেরকে পবিত্র কুরআনের পাশাপাশি আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘হে লোকসকল! নিশ্চয় আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে গেলাম তোমরা তা ধারণ করলে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না : আল্লাহর গ্রন্থ (আল কুরআন) এবং আমার ইতরাত (আহলে বাইত)।’
[প্রাগুক্ত,হাদীস নং ৩৭২৪]
★অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে: ‘এ দু’টি কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না কাওসার নামক ঝর্নায় আঁমার সাথে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত।অতএব,তোমরা লক্ষ্য কর আমার পরে এতদুভয়ের সাথে তোমরা কীরূপ আচরণ করবে।’
[প্রাগুক্ত,হাদীস নং ৩৭২৬]
✊আলী ও ফাতিমা (রাঃ) এর জীবনের কঠিন পরীক্ষায় তারা উতরে গেল।অভাব ও টানাটানির সংসারটি আবার প্রেম প্রীতি ও সহমর্মিতায় ভরে গেলে।হযরত ফাতিমা (রাঃ) এর গর্ভে দুটি পুত্র সন্তান হযরত ঈমাম হাসান ও হযরত ঈমাম হোসাইন এবং দুইটি কন্যা সন্তান হযরত উম্মে কুলছুম ও হযরত জয়নব জন্ম গ্রহণ করেন।
[আল এস্তীআব: পৃষ্ঠা ৭৭১,১৯]
✌গুরুত্বপূর্ন ঘটনার বিচারে এরা সকলেই ইসলামের ইতিহাসে অত্যান্ত মশহুর হয়ে আছেন।হযরত (ﷺ) এদের সকলকেই অত্যান্ত ভালবাসতেন।হযরতের কন্যাদের মধ্যে কেবল হযরত ফাতিমা (রাঃ) ই এ গৌরব লাভ করেন যে,তার মাধ্যমেই নবীজীর বংশ টিকে আছে।
[উসুদুল সাবাহ্ পৃষ্ঠা ৫২০]
ফাতিমার (রাঃ) সব সন্তানই ছিল হযরত রাসূলে করীম (ﷺ) এর কলিজার টুকরা।বিশেষতঃ হাসান ও হোসাইনের মধ্যে তিনি যেন নিজের পরলোকগত পুত্র সন্তানদেনকে খুজে পান।তাই তাদের প্রতি ছিল বিশেষ মহব্বত।একদিন তিনি তাদের একজনকে কাঁধে করে মদিনার বাজারে ঘুরছেন।নামাজের সময় হলে তিনি মসজিদে ঢুকলেন এবং তাকে খুব আদরের সাথে এক পাশে বসিয়ে নামাজের ইমাম হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় সেজদায় কাটালেন যে,পিছনের মোক্তাদিরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।নামাজ শেষে কেউ একজন জিজ্ঞেস করলঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এত লম্বা সেজদা করছেন যে,আমরা ধারণা করেছিলাম যে কিছু একটা ঘটেছে।অথবা ওহী নাজিল হয়েছে। জবাবে তিনি বললেনঃ না,তেমন কিছু ঘটেনি।আসল ঘটনা হলো আমার ছেলে আমার পিঠে চরে বসেছিল।আমি চেয়েছি তার ইচ্ছা পূর্ণ হউক। তাই তাড়াতাড়ি করিনি।[প্রাগুপ্ত ৬৩০ পৃষ্ঠা]
✊একদিন রাসূল (ﷺ) মিম্বরের উপর বসে ভাষণ দিচ্ছেন।এমন সময় দেখলেন হাসান ও হোসাইন দুই ভাই লাল জামা পড়ে নানাজীর দিকে হেটে আসছে।তিনি ভাষণ বন্ধ করে মিম্বর থেকে নেমে গিয়ে তাদের দুজনকে উঠিয়ে সামনে এনে বসান।তারপর তিনি উপস্থিত জন মন্ডলীকে লক্ষ্য করে বলেনঃ আল্লাহ সত্যিই বলেছেন ‘তোমাদের সম্পদ ও সন্তান সন্তুতি পরীক্ষা বিশেষ’।
[সূরা আত তাগাবুন: আয়াত নং ১৫]
আর একদিনের ঘটনা রাসূল (ﷺ) ফাতিমা-আলী (রাঃ) এর বাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে ব্যস্ততার সাথে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় হোসাইনের কান্নার আওয়াজ তার কানে গেল।তিনি বাড়ীতে ঢুকে মেয়েকে তিরস্কারের সুরে বললেনঃ তুমি কি জাননা তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয়। [তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়ত আন নবুয়া ৬২৭]
নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (عليه السلام) এঁর জীবন কাহিনি- ৩য় পর্ব
দানশীলতা
★১৫. ইমাম যাইনুল আবেদীন (আঃ) বলেন: আসমা বিনতে উমাইস আমার নিকট এভাবে বর্ণনা করেছেন: “একদা আমি হযরত ফাতেমার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলাম।যখন হযরত রাসূলে আকরাম (ﷺ) ফাতেমার গৃহে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন যে,ফাতেমা স্বর্ণের একটি গলার হার পড়ে আছে যা আমিরুল মু’মিনীন আলীর (আ:) গণীমতের অর্থ থেকে ক্রয় করেছিলেন।তৎক্ষণাৎ মহানবী (ﷺ) বলেন: হে ফাতেমা! মানুষ যেন বলতে না পারে মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা প্রতাপশালী বাদশাহ্দের পোশাক পরিধান করেছে।তখন হযরত ফাতেমা গলার হার খুলে বিক্রি করে দিলেন।আর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে একজন দাস ক্রয় করে তাকে মুক্ত করে দিলেন।রাসূল (ﷺ) তাঁর একাজে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃঃ ৮১,উয়ুনু আখবার আর রিযা (আঃ),২য় খণ্ড,পৃঃ ৪৫।অল্প কিছু তারতম্যসহ সংক্ষিপ্তাকারে ‘মানাকিবে শাহরে আশুব,৩য় খণ্ড,পৃঃ ১২১-এ উল্লিখিত হয়েছে]
★১৬. ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: “রাসূল (ﷺ) সফরে বের হওয়ার পূর্বে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ করতেন।সর্বশেষ যার কাছ থেকে তিনি বিদায় নিতেন তিনি হলেন হযরত ফাতেমা এবং তাঁর গৃহ থেকে সফরের যাত্রা শুরু করতেন।আর যখন সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমার সাথে সাক্ষাৎ করতেন অতঃপর অন্যান্য লোকজনদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন।একবার হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে যুদ্ধের গণিমতের কিছু অংশ হযরত আলীর ভাগে পড়েছিল।তিনি সেই অংশটুকু হযরত ফাতেমাকে দিয়ে চলে গেলেন। নবীকন্যা তা দিয়ে দু’টি রূপার চুড়ি এবং একটি পর্দার কাপড়ের ব্যবস্থা করলেন।তিনি সেই পর্দা গৃহের দ্বারে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।রাসূল (ﷺ) সফর থেকে ফিরে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং অন্যান্য বারের ন্যায় এবারো সর্বপ্রথম হযরত ফাতেমার গৃহে প্রবেশ করেন।হযরত ফাতেমা আনন্দভরে আবেগ- আপ্লুত হয়ে পিতাকে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্যে এগিয়ে আসেন। তখন মহানবী (ﷺ) হযরত ফাতেমার হাতে চুড়ি আর গৃহের দ্বারে ঝুলানো পর্দা অবলোকন করেন।
★রাসূল (ﷺ) গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ না করে দরজার পার্শ্বে বসে গেলেন।সেখান থেকে হযরত ফাতেমাকে দেখা যাচ্ছিল।এ অবস্থা দেখে হযরত ফাতেমা ক্রন্দন শুরু করে দেন।তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন।তিনি মনে মনে বলেন এর পূর্বে তো আমার পিতাকে কখনো আমার সাথে এমন আচরণ করতে দেখি নি।অতঃপর তিনি তাঁর দু’পুত্রকে (ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন) ডাকলেন এবং একজনের হাতে দরজার পর্দা খুলে আর অপরজনের হাতের চুড়ি খুলে অন্যজনকে দিয়ে বললেন: এগুলো আমার বাবার কাছে নিয়ে যাও।তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম দিয়ে বলবে: “আপনি সফরে যাওয়ার পর এগুলো ছাড়া অন্য কিছুর ব্যবস্থা করি নি।এখন এগুলো দিয়ে আপনার যা খুশী তা করুন,আপনি যে পথে খরচ করতে চান করুন।”
★হযরত ফাতেমার দু’সন্তান মায়ের পক্ষ থেকে মহানবী (ﷺ)-এঁর কাছে সব কথা খুলে বললেন।রাসূল (ﷺ) হযরত ফাতেমার দু’সন্তানকে চুম্বন দিয়ে তাদেরকে কোলে তুলে নিলেন।তাদের দু’জনকে নিজের দু’হাটুর উপর বসিয়ে নির্দেশ দিলেন,ঐ দু’টি চুড়ি ভেঙ্গে যেন টুকরো করা হয়।তিনি সুফফার (صُفَّة) বাসিন্দাদের মাঝে টুকরো চুড়িগুলো বিতরণ করে দিলেন।তারা এমন একদল লোক ছিলেন যাদের না কোন বাড়ী-ঘর ছিল,না কোন সম্পদ ছিল।অতঃপর দরজার পর্দার কাপড়-যা দৈর্ঘে ছিল লম্বা কিন্তু প্রস্থে কম ছিল-তাদের মধ্যকার বস্ত্রহীন লোকদের মধ্যে ভাগ করে দেন।
★অতঃপর রাসূল (ﷺ) বলেন: “আল্লাহ্ যেন ফাতেমার উপর রহম করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ এ পর্দার পরিবর্তে বেহেশতী বস্ত্র তাকে দান করবেন এবং এ চুড়িগুলোর পরিবর্তে তাকে বেহেশতের অলংকার দান করবেন।”
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩ তম খণ্ড,পৃষ্টা ৮৩,৮৪।মাকারিমুল আখলাক,পৃ. ৯৪,৯৫ (বৈরুত প্রিন্ট)।উক্ত রেওয়ায়েত সংক্ষিপ্তসার নিম্নের গ্রন্থদ্বয়েও উল্লেখ আছে : মুনতাহাল আমাল,পৃ. ১৫১,১৬০ এবং মানাকিবে শাহরে আশুব,৩য় খণ্ড,পৃ. ১২১]
★১৭. হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ্ আনসারী বলেন: “একদিন রাসূলে আকরাম (ﷺ) আসরের নামাজ আমাদের সাথে আদায় করেন।নামাজ শেষে তিনি কেবলামুখী হয়ে বসেছিলেন এবং লোকজন তাঁর চারপাশে জড় হয়েছিল।তখন একজন আরব বৃদ্ধ মুহাজির (যার পরনে অত্যন্ত পুরনো কাপড় ছিল) মহানবীর নিকট আসেন।সে লোকটি বার্ধক্যের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না।রাসূলে খোদা (ﷺ) লোকটির সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।ঐ বৃদ্ধ লোকটি বলেন: “ইয়া রাসুলুল্লাহ্,আমি ক্ষুধার্ত,আমাকে অন্ন দান করুন।আমার পরনের কাপড় নেই, আমাকে পরিধেয় বস্ত্র দান করুন।আমি নিঃস্ব,দরিদ্র,আমাকে দয়া করে কিছু দিন।”
★রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন: “আঁমার দেয়ার মত কিছু নেই।তবে কোন ভাল কাজের দিক-নির্দেশনা দান তা সম্পাদন করার অনুরূপ।তুমি ফাতেমার বাড়িতে যাও।সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালবাসে।সে আল্লাহর পথে দান করে থাকে।”
★হযরত ফাতেমার গৃহ রাসূল (ﷺ)-এঁর গৃহ সংলগ্ন ছিল এবং ঐ বাড়ীটি নবী (ﷺ)-এঁর স্ত্রীদের থেকে পৃথক ছিল।
রাসূল (ﷺ) হযরত বেলালকে ডেকে বললেন: হে বেলাল,তুমি এই বৃদ্ধ লোকটিকে ফাতেমার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিয়ে আস।বৃদ্ধ লোকটি হযরত বেলালের সাথে হযরত ফাতেমার গৃহের দ্বারে পৌঁছেন।সেখান থেকেই বৃদ্ধ উচ্চৈঃস্বরে বললেন: আসসালামু আলাইকুম,হে নবুওয়াতের পরিবার,ফেরেশতাদের গমনাগমনের স্থল,আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিলের জন্যে হযরত জিবরাঈল আমিনের অবতীর্ণ হওয়ার স্থান।হযরত ফাতেমা উত্তরে বললেন: “ওয়া আলাইকুমুস সালাম,আপনি কে?”
বৃদ্ধ লোকটি বললেন: “আমি একজন বৃদ্ধ আরব,যে কষ্ট ও দুরাবস্থা থেকে (মুক্তি পাবার লক্ষ্যে) হিজরত করেছে এবং মানবকুলের মুক্তিদাতা আপনার পিতার পানে ছুটে এসেছে।এখন হে মুহাম্মদ (ﷺ)-এঁর দুহিতা! আমি ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীন।আমাকে দয়া ও অনুগ্রহ দানে ধন্য করুন।আল্লাহ্ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন।”
✊এ সময়ে হযরত ফাতেমা,হযরত আলী ও রাসূল (ﷺ) তিন দিন যাবৎ কিছু খান নি।নবী করীম (ﷺ) তাদের অবস্থা ভাল করেই জানতেন।হযরত ফাতেমা দুম্বার চামড়া বিশিষ্ট হাসান ও হুসাইনের বিছানাটি হাতে তুলে নিয়ে বললেন: হে দরজার বাইরে দন্ডায়মান ব্যক্তি! এটা নিয়ে যাও।আশা করি আল্লাহ্ তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।
আরব বৃদ্ধটি বললেন: “হে মুহাম্মদ (ﷺ)-এঁর কন্যা! আপনার কাছে আমি ক্ষুধা নিবৃত্তির কথা বলেছি আর আপনি আমাকে পশুর চামড়া দিচ্ছেন।আমি এ চামড়া দিয়ে কি করবো?
★হযরত ফাতেমা বৃদ্ধ লোকটির কথা শুনে হযরত হামযার কন্যা ফাতেমার উপহার তার গলার হারটি খুলে বৃদ্ধ লোকটিকে দান করে দিলেন আর বললেন,এটাকে নিয়ে বিক্রি কর।আশা করি আল্লাহ্ তোমাকে এর চেয়ে আরো উত্তম কিছু দান করবেন।আরব মুহাজির গলার হারটি নিয়ে মসজিদে নববীতে পৌঁছলেন।তখন নবী (ﷺ) তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে বসে ছিলেন।বৃদ্ধ আরব বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্! এই গলার হারটি হযরত ফাতেমা আমাকে দান করেছেন।আর তিনি বলেছেন: “এ গলার হারটি বিক্রি করো।আশা করি আল্লাহ্ তোমার প্রয়োজন মিটিয়ে দিবেন।”
★রাসূলুল্লাহ্ আর চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না।তিনি বললেন: যে জিনিস সমগ্র নারীকুলের নেত্রী ফাতেমা তোমাকে দিয়েছে কি করে সম্ভব তার দ্বারা আল্লাহ্ তোমার প্রয়োজন মিটাবেন না?
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির উঠে দাঁড়ালেন।তিনি বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমাকে কি এই গলার হারটি কেনার অনুমতি দেবেন? রাসূল (ﷺ) জবাবে বললেন: “হে আম্মার! এটা ক্রয় কর।যদি সমস্ত জিন ও ইনসান এটা ক্রয়ের মধ্যে অংশগ্রহণ করে আল্লাহ্ তাদের সকলের উপর থেকে দোজখের আগুন উঠিয়ে নিবেন।” হযরত আম্মার জিজ্ঞেস করেন: হে আরব বৃদ্ধ! এ গলার হারটি কত বিক্রি করবে? বৃদ্ধ লোকটি জবাবে বললেন:
“এ গলার হারের পরিবর্তে আমার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে,আমি যেন তা দিয়ে কিছু রুটি ও মাংস কিনে ক্ষুধা নিবারণ করতে পারি এবং একটা কাপড় কিনে আমার দেহ আবৃত করতে পারি যেন সে কাপড় দিয়ে আল্লাহর দরবারে নামাজে দাঁড়াতে পারি।আর কয়েকটি দিনারই যথেষ্ট যা আমি আমার পরিবারকে দিতে পারি।” হযরত আম্মারের কাছে নবী (ﷺ) কর্তৃক প্রাপ্ত খায়বরের যুদ্ধের গণিমতের কিছু মাল অবশিষ্ট ছিল।তিনি বলেন: “এ গলার হারের বিনিময়ে আমি তোমাকে বিশ দিনার ও দু’শ দেরহাম,একটি ইয়েমানী পোশাক এবং একটি উট দিবো যার মাধ্যমে তুমি তোমার পরিবারের নিকট পৌঁছতে পার।আর তাতে তোমার ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থাও হবে।”
★বৃদ্ধ লোকটি বললেন: হে পুরুষ! তুমি অত্যন্ত দানশীল।অতঃপর সে লোকটি হযরত আম্মারের সাথে তাঁর গৃহে গেল। হযরত আম্মার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সব কিছু সে লোকটিকে দিলেন।বৃদ্ধ লোকটি মালামাল নিয়ে রাসূল (ﷺ)-এঁর কাছে এলেন।তিনি জিজ্ঞেস করেন: “এখন তোমার ক্ষুধা মিটেছে? তোমার পরিধেয় বস্ত্র পেয়েছো?”
উত্তরে লোকটি বললেন। “জি,হ্যাঁ! আমার প্রয়োজন মিটেছে।আমার পিতা-মাতা আপনার জন্যে উৎসর্গ হোক।”
রাসূল (ﷺ) বললেন: “তাহলে ফাতেমার জন্যে তাঁর অনুগ্রহের কারণে দোয়া কর।”
তখন আরব মুহাজির লোকটি এভাবে দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ্! তুমি সর্বদাই আমার প্রভু।তুমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্যের আমি ইবাদত করি না।তুমি সকল ক্ষেত্রে থেকে আমার রিযিকদাতা। হে পরোয়ারদিগার! ফাতেমাকে এমন সব কিছু দাও যা চক্ষু কখনো অবলোকন করে নি আর কোন কর্ণ কখনো শ্রবণ করে নি।”
★প্রিয় নবী (ﷺ) তার দোয়ার শেষে আমিন বললেন এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি তাকিয়ে বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ এ পৃথিবীতে ফাতেমাকে এই দোয়ার ফল দান করেছেন।কেননা আমি তাঁর পিতা, আমার সমকক্ষ পৃথিবীতে অন্য কেউ নেই।আর আলী তাঁর স্বামী।যদি আলী না থাকতো তাহলে কখনো তাঁর সমকক্ষ স্বামী খুঁজে পাওয়া যেত না।আল্লাহ্ ফাতেমাকে হাসান ও হুসাইনকে দান করেছেন।বিশ্বের বুকে মানবকুলের মাঝে তাদের ন্যায় আর কেউ নেই।কেননা তাঁরা বেহেশতের যুবকদের সর্দার।”
★রাসূল (ﷺ)-এঁর সামনে হযরত মিকদাদ,হযরত আম্মার ও হযরত সালমান ফারসী দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ফাতেমার মর্তবা ও মর্যাদার ব্যাপারে আরো কিছু বলবো?
“বলুন,ইয়া রাসূলুল্লাহ্! ”তারা উত্তর দিলেন।তখন রাসূল (ﷺ) বললেন: “জিবরাঈল আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে ফাতেমার দাফন সম্পন্ন হবার পর কবরে প্রশ্নকারী দু’জন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করবে: তোমার প্রভু কে?
জবাব দিবে: আল্লাহ্।অতঃপর জিজ্ঞেস করবে: তোমার নবী কে?
জবাবে বলবে: আমার পিতা।আরো জিজ্ঞেস করবে,“তোমার যুগের ইমাম ও নেতা কে ছিল?
জবাব দিবে: এই যে আমার কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে,আলী ইবনে আবি তালিব।
★নবী করীম (ﷺ) আরো বলেন,তোমরা জেনে রাখো, আমি তোমাদের নিকট ফাতেমার আরো যোগ্যতা ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করতে চাই। “ফাতেমাকে রক্ষা করার জন্যে আল্লাহ্ ফেরেশতাদের একটা বড় দলকে দায়িত্ব দিয়েছেন যেন তারা ফাতেমাকে সামনে-পিছনে, ডানে-বায়ে থেকে হেফাজত করতে পারে এবং তারা তাঁর সারা জীবন তাঁর সাথেই রয়েছেন। আর কবরে এবং কবরে মৃত্যুর পরেও তাঁর সাথে আছেন।তারা তাঁর এবং তাঁর পিতা,স্বামী ও সন্তানদের উপর অসংখ্য দরুদ পাঠ করছেন।অতঃপর যারা আমার ওফাতের পর আমার রওজামোবারক যিয়ারত করবে তারা যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমাকে যিয়ারত করলো। আর যারা ফাতেমার সাক্ষাত লাভ করে তারা আমার জীবদ্দশায়ই আমাকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করলো।যারা আলী বিন আবি তালিবের সাথে সাক্ষাৎ করলো মনে করতে হবে ফাতেমারই সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছে।যারা হাসান ও হুসাইনকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করলো তারা আলী বিন আবি তালিবেরই সাক্ষাৎ লাভ করলো।আর যারা হাসান ও হুসাইনের বংশের সন্তানদের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করলো তারা ঐ দুই মহান ব্যক্তির সাক্ষাতেই সৌভাগ্যবান হলো।”
★পরক্ষণে হযরত আম্মার গলার হারটি নিয়ে মেশক দ্বারা সুগন্ধযুক্ত করলেন এবং ওটাকে ইয়েমেনী কাপড়ে মোড়ালেন।তার একটা দাস ছিল।তার নাম ছিল সাহম। খায়বরের যুদ্ধের গণিমতের মালের যে অংশ তাঁর ভাগে পড়েছিল তা দিয়ে তিনি এই গোলামকে ক্রয় করেছিলেন।তিনি গলার হারটিকে তাঁর এ গোলামের হাতে দিয়ে বললেন: এটা রাসূল (ﷺ)-কে দিও আর তুমিও এখন থেকে তাঁর হয়ে গেলে।
★গোলাম গলার হারটি নিয়ে রাসূল (ﷺ) খেদমতে পৌঁছে আম্মারের বক্তব্য তাঁর কাছে বলল।হযরত রাসূলে আকরাম (ﷺ) বললেন: তুমি ফাতেমার কাছে চলে যাও।তাকে গলার হারটি দিয়ে দাও আর তুমিও এখন থেকে তাঁর হয়ে কাজ করবে। লোকটি হযরত ফাতেমার কাছে গলার হারটি নিয়ে গেল এবং নবী (ﷺ)-এঁর কথা তাঁর কাছে পৌঁছালো।হযরত ফাতেমা গলার হারটি গ্রহণ করলেন আর দাসটিকে মুক্ত করে দিলেন।দাসটি হাসি ধরে রাখতে পারলো না।হযরত ফাতেমা প্রশ্ন করলেন: “তোমার হাসির কারণ কি?”
★সদ্য মুক্ত দাসটি বলল: “এই গলার হারের অভাবনীয় বরকত আমার মুখে হাসি ফোটাতে বাধ্য করেছে।যা ক্ষুধার্তকে অন্ন দিয়ে পেট ভর্তি করেছে,বস্ত্রহীন ব্যক্তিকে বস্ত্র পরিধান করিয়েছে এবং অভাবীর অভাব পূরণ করেছে আর একজন দাসকে শৃঙ্খলমুক্ত করেছে। অবশেষে গলার হার আবার তার মালিকের কাছে ফিরে এসেছে।”
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃষ্টা ৫৬-৫৮]
জ্যোতির্ময় চাদর
★১৮. একবার আলী (আ.) জনৈক ইহুদীর কাছ থেকে সামান্য পরিমান যব ঋণ নিয়েছিলেন।ইহুদী লোকটি ঋণের পরিবর্তে কিছু বন্ধক চাইলো।হযরত আলী (আ.) হযরত ফাতেমার পশমী চাদরটি বন্ধক রাখলেন।ইহুদী লোকটি চাদরটি নিয়ে তার কোন একটি কক্ষে রেখে দিল। রাত্রিতে কোন এক কাজের জন্যে ইহুদীর স্ত্রী ঐ কক্ষে প্রবেশ করলে দেখতে পেল যে ঘরের কোন জায়গা থেকে আলোকছটা সারা ঘরকে আলোকিত করেছে।মহিলা তার স্বামীকে জানালো যে,ঐ ঘরের ভিতরটা আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে।ইহুদী লোকটি তার স্ত্রীর কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে।সে একেবারে ভুলেই গেছে যে সে কক্ষে হযরত ফাতেমার চাদরখানা রাখা আছে।লোকটি দ্রুত সে কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পেল যে,হযরত ফাতেমার চাদরটি থেকে নূর ভেসে আসছে।আর সে নূর দিয়েই সমস্ত ঘর আলোকিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন উজ্জ্বল চন্দ্র অত্যন্ত নিকট থেকে আলো বিতরণ করছে। ইহুদী লোকটি অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল।লোকটি বুঝতে পারলো যে,এ আলো হযরত ফাতেমার চাদরের কাছ থেকেই আসছে।সে তার আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিল।মহিলাটিও তার আত্মীয়দের সংবাদ পাঠালো। দেখতে দেখতে প্রায় আশিজন ইহুদী জড়ো হয়ে গেল।তারা সবাই ঘটনাটি স্বচক্ষে অবলোকন করলো।পরিশেষে তারা সবাই কলেমা পাঠ করে ইসলামে দীক্ষিত হলো।
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃষ্টা ৪০ এবং উক্ত রেওয়ায়াতের সার-সংক্ষেপ ‘মানাকিবে শাহরে আশুব’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।]
বস্ত্রহীন পবিত্র রমণীর জন্যে বেহেশতী পোশাক:
★১৯. একদা কয়েকজন ইহুদী একটা বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এ কারণে তারা মহানবীর নিকট এসে বললো: “প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের উপর আপনার অধিকার আছে।আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি দয়া করে আপনার মেয়ে ফাতেমাকে আমাদের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে পাঠাবেন।আশা করি তার বদৌলতে এই বিয়ের অনুষ্ঠান আরো বেশী সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। এ নিমন্ত্রনে হযরত ফাতেমার অংশগ্রহণের ব্যাপারে তারা নবী (ﷺ)-কে বেশ পীড়াপীড়ি করছিল।”
মহানবী (ﷺ) বললেন: “সে (ফাতেমা) আলী বিন আবি তালিবের স্ত্রী।আর তার নির্দেশেই সে (ফাতেমা) পরিচালিত হয়।”
তারা বিনীত কণ্ঠে এ ব্যাপারে নবী (ﷺ)- কে মধ্যস্থতা করার জন্যে আরজি পেশ করে।
ইহুদীরা এ বিয়ের অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় সব ধরনের জাকজমকপূর্ণ পোশাক, অলংকার ও সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটিয়েছিল।তারা মনে করেছিল যে,হযরত ফাতেমা পুরাতন ও ছেঁড়া কাপড় পরিধান করে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে।আর তারা এভাবে তাঁকে অপমান ও খাটো করতে চেয়েছিল।
★এ সময়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ অলংকারাদিসহ এমন জান্নাতি পোশাক নিয়ে আসলেন যার দ্বিতীয়টি মানুষ কখনো দেখেনি।হযরত ফাতেমা (আ:) সেই কাপড় পড়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলে দর্শকরা তার কাপড়ের রং দেখে ও সুঘ্রান পেয়ে বিস্ময়াভিভূত হয়ে যায়।হযরত ফাতেমা (আ:) ইহুদীদের গৃহে প্রবেশ করলে ইহুদী মহিলারা তাঁর সামনে সেজদাবনত হয়ে মাটিতে চুমু খেতে শুরু করে। সেদিন উপস্থিত অনেক ইহুদী এ অলৌকিক ঘটনা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ৩০]
ক্ষুধা এবং আসমানী খাদ্য
★২০. হযরত আবু সাঈদ খুদরী বলেন: “একদা আলী ইবনে আবি তালিব ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিলেন।তিনি হযরত ফাতেমাকে বলেন: তোমার কাছে কি আমাকে দেবার মত কোন খাবার আছে? হযরত ফাতেমা বলেন: না। সেই আল্লাহর কসম! যিনি আমার পিতাকে নবুওয়াত এবং তোমাকে তাঁর উত্তরাধিকারীত্ব দানে সম্মানিত করেছেন,কোন খাবার আমার কাছে নেই। কোন খাবার ছাড়াই দু’দিন গত হয়ে গেছে।যৎসামান্য খাবার ছিল তা তোমাকে দিয়েছিলাম।তোমাকে আমি এবং আমার আদুরে দুই সন্তানের উপর স্থান দিয়েছি।
উত্তর শুনে হযরত আলী বলেন: কেন তুমি আমাকে আগে অবহিত করোনি,তাহলে তো আমি তোমাদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতাম।হযরত ফাতেমা বলেন: হে আবুল হাসান! আমি যে জিনিস তোমার কাছে নেই তা চাপিয়ে দিতে আল্লাহর কাছে লজ্জা পাই।
হযরত আলী হযরত ফাতেমার কাছ থেকে বিশ্বাস ও আল্লাহর উপর নির্ভর করে ঘরের বাইরে চলে গেলেন এবং পরে তিনি কারো কাছ থেকে এক দিনার ঋণ নিয়েছিলেন।
তিনি তা দিয়ে তাঁর পরিবারের জন্যে কিছু ক্রয় করার মনস্থ করেন কিন্তু তখন হযরত মিকদাদ বিন আল্ আসওয়াদের সাথে তাঁর দেখা হয়।তিনি মিকদাদকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবস্থায় দেখতে পান। সেদিনের আবহাওয়া প্রচন্ড গরম ছিল। সূর্যের উত্তাপে তাঁর ছাতি ফেটে যাচ্ছিল আর পায়ের নিচের মাটিও ছিল ভীষণ উত্তপ্ত।এহেন অবস্থা তাকে বেশ কষ্ট দিচ্ছিল।তিনি মিকদাদকে জিজ্ঞেস করেন: হে মিকদাদ,তোমার এমন কি ঘটেছে যার কারণে এ সময়ে তুমি বাড়ী ও পরিবার ছেড়ে বাইরে আসতে বাধ্য হয়েছো? হযরত মেকদাদ বলেন: হে আবুল হাসান! আমাকে আমার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিন,আমার অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করবেন না।তখন হযরত আলী (আ:) বললেন: ভাই,তুমি না বলে আমার কাছ থেকে চলে যেতে পারবে না। মিকদাদ বলেন: ভাই,আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দিন।আমার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইবেন না।
হযরত আলী বললেন: ভাই,এটা অসম্ভব। তুমি কোনক্রমে আমার কাছ থেকে লুকাতে পারবে না।
তখন হযরত মিকদাদ বলেন: হে আবুল হাসান! যেহেতু আপনি জোর করে ধরেছেন তাই বলছি।আমি সেই আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি যিনি হযরত মুহাম্মদকে (ﷺ) নবুওয়াত এবং আপনাকে ইমামত দানে সম্মানিত করেছেন,আমি আমার পরিবারের জন্যে রোজগারের উদ্দেশ্যে কাজের সন্ধানে বের হয়েছি। কেননা আমি যখন আমার পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে ঘরের বাইরে চলে আসছিলাম তখন তারা ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছিল।আর আমার পরিবারের কান্না শুনে সহ্য করতে না পেরে চিন্তিত মন নিয়ে ঘরের বাইরে চলে এসেছি। আমার এই হলো অবস্থা।
হযরত আলীর চোখে এমনভাবে অশ্রু ভরে গেল যে তাঁর দাড়ি মোবারক পর্যন্ত অশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগলো।তিনি মেকদাদকে বললেন: তুমি যার কসম দিয়েছ আমিও তার কসম দিয়ে বলছি যে আমিও ঠিক তোমার মত একই কারণে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসেছি।আমি একটি দিনার ঋণ করেছিলাম।এক্ষনে আমি তোমাকে আমার উপর অগ্রাধিকার দিচ্ছি।এ বলে তিনি দিনারটি তাকে দিয়ে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি যোহর,আসর এবং মাগরিব নামাজ আদায় করলেন।মহানবী (ﷺ) মাগরিব নামাজ সমাপ্ত করে আলীর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ইশারা করলেন।আলী প্রথম কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন।আলী উঠে দাঁড়ালেন এবং রাসূল (ﷺ)-এঁর পিছনে পিছনে হাঁটা শুরু করলেন।
অবশেষে মসজিদের দরজার নিকট মহানবীর সাথে মিলিত হয়ে তাঁকে সালাম করেন এবং রাসূল (ﷺ) তাঁর সালামের উত্তর দিলেন।মহানবী (ﷺ) বলেন: হে আবুল হাসান! আমি কি রাত্রের খাবারের জন্যে তোমার সাথে আসতে পারি?
হযরত আলী মাথা নিচু করে চুপিসারে দাঁড়িয়ে রইলেন।তিনি লজ্জায় হতবাক। মহানবী (ﷺ)-এঁর সামনে কি উত্তর দিবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।মহানবী (ﷺ) দিনারের ঘটনা এবং এটা কোথা থেকে ব্যবস্থা করেছে আর তা কাকে দান করেছে-এসব কিছু সম্পর্কে অবগত ছিলেন।আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন তাঁর রাসূলকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সেই রাত্রিতে যেন তিনি আলীর কাছে যান।রাসূল (ﷺ) আলীর নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করে বললেন: হে আবুল হাসান! কেন তুমি না বলে আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ না অথবা হ্যাঁ বলে তোমার সাথে যাওয়ার জন্যে বলছো না?
আলী লজ্জায় নবী (ﷺ)-এঁর সম্মানে বললেন: চলুন! আমি আপনার খেদমতে আছি।নবী করীম (ﷺ) আলীর হাত ধরে ফাতেমার গৃহে প্রবেশ করলেন।তখন ফাতেমা নামাজ শেষে তাঁর মেহরাবে অবস্থান নিয়েছিলেন।তাঁর পিছনে একটি বড় হাড়ি রাখা ছিল।সেখান থেকে অনবরত বাষ্প বের হচ্ছিল।ফাতেমা পিতার গলার কণ্ঠ শুনে নামাজেন স্থান ত্যাগ করে তাকে সালাম দিলেন।ফাতেমা (আ.) নবী (ﷺ)-এঁর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন।নবী (ﷺ) তাঁর সালামের উত্তর দিলেন।তিনি তাঁর পবিত্র হাত দ্বারা ফাতেমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।নবী (ﷺ) ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করেন:
“তোমার দিনকাল কেমন কাটছে? আল্লাহ তায়ালা তোমার উপর কৃপা করুক। আমাদের রাতের খাবার দাও।আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করুন।নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে ক্ষমা করেছেন।ফাতেমা খাবারের পাতিল নবী (ﷺ) এবং হযরত আলীর সামনে রাখলেন।আলী খাবারের প্রতি দৃষ্টি দিলেন এবং তার সুঘ্রান পেয়ে অবাক কণ্ঠে ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করেন: হে ফাতেমা! এ খাবার তোমার কাছে কোথা থেকে পৌঁছেছে-যা কোনদিন দেখিনি? এরকম সুস্বাদু খাবার তো আগে কোনদিন খাইনি?
মহানবী (ﷺ) হযরত আলীর স্কন্ধে হস্ত মোবারক রেখে ইশারা করে বললেন: হে আলী! এ খাবার তোমার সেই দিনারের পুরস্কার ও প্রতিদান।মহান আল্লাহ্ কুরআনুল কারীমে এরশাদ করেন:
إِنَّ اللهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَآءُ بِغَيْرِحِسَابٍ
অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তাকে অফুরন্ত রিজিক দান করেন।”
[সূরা আলে ইমরান: আয়াত নং ৩৭]
★অতঃপর আনন্দে আল্লাহর শোকর গুজারিতে উদ্বেলিত অবস্থায় প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এঁর চক্ষুযুগল থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।তিনি বলেন: সেই আল্লাহকে ধন্যবাদ যিনি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বেই তোমাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন।হে আলী,আল্লাহ্ তোমাকে হযরত যাকারিয়া (আ.) এবং ফাতেমা (আ.)-কে হযরত মারিয়ামের অবস্থার ন্যায় করেছেন।
[কাশফুল গুম্মাহ্,২য় খণ্ড,পৃ. ২৬,২৯। আমালী,তুসী,২য় খণ্ড,পৃ. ২২৮-২৩০। বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ৫৯-৬১।এর সংক্ষিপ্তসার বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ২৯-তেও রয়েছে।মানাকিবে শাহরে আশুব,৩য় খণ্ড,পৃ. ১১৭]
★আল্লাহ্ পাক বলেন
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا اْلْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا
অর্থাৎ “যখনি যাকারিয়া (মারিয়ামের) মেহরাবের স্থানে প্রবেশ করতো তখনি তাঁর নিকট রিযিক (খাবার) দেখতে পেতো।
[সূরা আলে ইমরান:আয়াত নং ৭) ংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংং