চুনতীতে শায়িত আজমগড়ী হযরতের তিন খলিফা
সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮
দক্ষিণ চট্টগ্রামের চুনতীতে পর পর শায়িত রয়েছেন আজমগড়ী হযরতের মহান তিন খলিফা। তাঁরা হলেন হযরত শাহ মাওলানা ফজলুল হক (রহ.), হযরত শাহ মাওলানা নজির আহমদ (রহ.) ও হযরত শাহ মাওলানা হাকিম মুনীর আহমদ (রহ.)। চুনতীর প্রাচীন কবর স্থান নিয়ে পাহাড়ের উপর এ মহান তিন অলি পর পরশায়িত। একই কম্পাউন্ডে আরও শায়িত রয়েছেন হযরত হাকিম শাহ মাওলানা তোফাজ্জলুর রহমান (রহ.)ও হযরত শাহ মাওলানা হাবিব আহমদ (রহ.)।
হযরত শাহ মাওলানা ফজলুল হক (রহ.):
হযরত শাহ মাওলানা ফজলুল হক (রহ.) চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন ক্ষণ জন্মা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি এককালে চট্টগ্রাম থেকে আকিয়াব পর্যন্ত শরীয়ত ও তরিক্বতে রবিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত সাইয়েদ আহমদ বেরলভী (রহ.) এর অন্যতম খলিফা হযরত আবদুল হাকিম (রহ.) (যার নামে চুনতী মাদ্রাসার নামকরণ) এর নাতি।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রামে সমাপ্ত করেন। অতঃপর তাঁর মামা হযরত মাওলানা খান বাহাদুর ওয়াজিউল্লাহ ছিদ্দিকী সাহেবের ভারতের উত্তরে প্রদেশস্থ কর্মস্থলে (সাব-জজ) অবস্থান করে পরবর্তী ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। মামার মৃত্যুতে চাচা মাওলানা আবদুর রশিদ ছাহেবের তত্ত্বাবধানে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা হতে ধর্মীয় উচ্চতর শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে এসে তিনি নিজ গ্রামস্থ চুনতী “সামিয়া মাদ্রাসার”( হাকিমিয়া মাদ্রা সার সাবেক নাম) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ কার্তিক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে “সামিয়া মাদ্রাসা” দারুণভাবে ক্ষতি গ্রস্ত হয়ে যায়। তখন তাঁকে রেঙ্গুন চলে যেতে পরিস্থিতি বাধ্য করে। তথায় একটি উর্দু মিডিয়াম মাদ্রাসার প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অতি অল্প কালের মধ্যে তিনি “গ্রান্ডমুফতি” হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করেন।
১৯১০ খ্রিস্টাব্দে আকিয়াবে হযরত মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.) (আজমগড়ী হযরত-রহ.) এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁর হাতে তরিক্বতে দাখিল হন। পরবর্তীতে তিনি খেলাফত লাভ করেন। এর আগে কলকাতা অবস্থান কালীন হযরত সূফি গোলাম সালমানী (রহ.) ও হযরত সাইয়েদ আবদুলবারী (রহ.) এর সংস্পর্শ লাভ করেছিলেন। হযরত সূফিফতেহ আলীওয়াইসী (রহ.) এর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল এবং ইন্তেকালে কলকাতা মানিকতলায় দাফনে শরীক হয়েছিলেন।
তিনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে চুনতীস্থ নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। শরীয়ত ও তরিক্বতের খেদ মতে নিজেকে আত্ননিয়োগ করেন। আজমগড়ী হযরতের মুরিদগণ ছবক তওয়াজ্জু নিতেন। তিনি ছিলেন গরীব দরদী। তাঁর দানশীলতা ও মেহমান দারী উল্লেখ করারমত। শরীয়ত বিরোধী কাজকর্ম ও কুসংস্কার তিনি এক দমপ্রশ্রয় দিতেন না। রিয়াজত, মুজাহেদা, মুরাকাবা ছিল তাঁর নিয়মিত আমল। নিজের জীবনে ১৫ হাজার বারের অধিক কুরআন খতম করেন। তিনি এক সাথে ৭ তরিক্বার খেলাফতপ্রাপ্ত। তাঁর জীবন অসংখ্য করা মতে ভরপুর। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়পাঞ্জাব, বেলুচ সহ বিভিন্ন রেজিমেন্টের সদস্যগণ তাঁর কাছে দোয়ার জন্য আসতেন।
হযরত মাওলানা ফজলুল হক (রহ.) আজমগড়ী হযরত (রহ.) এর এতদঞ্চলের প্রথম খলিফা। তিনি আজমগড়ী হযরত (রহ.) এর চেয়ে দশ বছর বড় ছিলেন। তিনি আকিয়ার ও রেঙ্গুন থেকে দেশে ফিরে এসেশরীয়ত ও ত্বরিকত্বের খেদ মতে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। হামেদিয়া সিলসিলার বিখ্যাত খলিফা হালিশহরস্থ হযরত হাফেজমুনীর উদ্দিন (রহ.) কে আজমগড়ীহযরতনির্দেশে ত্বরিকত্বেরতা’ লিমদিতে একাধিকবার হালিশহর গমন করেন।
তাঁর মহান পীর আজমগড়ী হযরত এতদাঞ্চলে তশরীফ আনলে তিনি সহায়তার ভূমিকা পালন করতেন। ছবক তওয়াজ্জুসহ নানা বিষয়ে আগত লোকজনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহ নিজের পীরের সহায়তা করতেন। আজমগড়ী হযরত চুনতী গমন করলে নিকটতম বাড়ি ঘরেও গমন করতেন। এখানেও তিনি সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করে গেছেন।
এ মহান অলি ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে বৃহস্পতিবার নিজ গ্রামে ইন্তেকাল করেন। পর দিন শুক্রবার তাঁর জানা যায় তখন কার আমলে প্রায় ১০ হাজার লেকের সমাগম হয়েছিল। চুনতীর কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন বিশাল কবরস্থানে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।
হযরত মাওলানা ফজলুল হক (রহ.) এর ইন্তেকালের পর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী, বাংলা মাঘ মাস ইছালেছওয়াব উপলক্ষে এক জেয়াফত তথা মেলা আয়োজন চলছিল। এ সংবাদ আজমগড়ী হযরত এর কানে যাওয়া মাত্র তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং ‘ ইয়ে সব্বন্ধকর’ বলে চুনতীতে সংবাদ পাঠিয়ে ছিলেন। সে থেকে এ অঞ্চলে আজমগড়ী হযরতের খলিফাগণের ইন্তেকালের পর জেয়াফত, ওরশ, মেলা ইত্যাদি করা বন্ধ হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য, তাঁর ভাতিজা মাস্টার জাফর সাহেব বলেন তাঁরমূল নাম ফজলুল হক হলেও আজম গড়ী হযরত তাঁকে ফজলেহ কবলে ডাকতেন।
হযরত শাহ মাওলা নানজির আহমদ (রহ.):
হযরত শাহ মাওলানা নজির আহমদ (রহ.) আজমগড়ী হযরত (রহ.) এর অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন খলিফা ছিলেন।
তাঁর জন্ম তারিখ বাসন তথ্য তালাশ করেও পাওয়া যায়নি। তিনি ইন্তেকাল করেছেন ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে জুলাই অথবা আগস্ট মাসে তথা বাংলা শ্রাবণ মাসে। একথা জানিয়েছেন তাঁর সুযোগ্য একমাত্র সন্তা নহযরতআলহাজ্ব মাওলানা হাবিব আহমদ। তিনি আরও জানান, তাঁর মরহুম পিতা ৫৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। এতে প্রতীয় মান হয় যে, হযরত মাওলানা নজীর আহমদ (রহ.) ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর মায়ের কাছে এবং তাঁর নানা হযরত মাওলানা কাজী ইউসুফ ছাহেবের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর চট্টগ্রাম শহরস্থ মোহসেনিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মোহসেনিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিলপাস করার পর মায়ের একমাত্র ছেলেহওয়ায় পারিবারিক প্রতিবন্ধক তার কারণে কলকাতা বা দেওবন্দ গমন না করে চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলীয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। তার আগে তিনি কিছুদিন মোহসেনিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সারাজীবন তরিক্বতের খেদমতের পাশাপাশি দারুল উলুম মাদ্রাসার অন্যতম আর্কষণীয় হেড মাওলানা হিসেবে জীবন কাটিয়ে দেন।
তিনি একজন উচ্চমানের পীর কামেল হয়েও চট্টগ্রাম দারুল উলুম মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে ওস্তাজুল আসাতুজা হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করেন। শুধু তাই নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামে আলেম সমাজসহ সব মহলে তিনি অতি উচ্চ মানের শ্রদ্ধাভাজন আলেমে দ্বীন হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। প্রাথমিক জীবনে দারুল উলুম মাদ্রাসায় সামান্য বেতনে অতি সাধারণভাবে কোন মতে জীবনযাপন করতেন। কিন্তু মহান আল্লাহপাকের বিশেষ মেহের বাণীতে কবিরাজী হেকিমীফর্মুলার সংমিশ্রণে‘বরশ’ নামে এত মোদক (হালুয়া) জাতীয় ঔষধ তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এ ঔষধ বিক্রির ওসিলায় তিনি শহরে ও গ্রামে যে সেবা প্রদান করেছেন। তাঁরএ সেবার পাশাপাশি উপার্জন হতে নিদর্শন স্বরূপ চন্দনপুরাস্থ ঐতিহ্যবাহী বরশবিল্ডিং এবং চুনতীতে ১৯৩৬/৩৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতল পাকা ভবন নির্মাণ করেন। তিনি সহায়-সম্পদসহ ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে বিশেষ অবদান রেখে যান। বিশেষ করে চুনতী হাকিমিয়া আলীয়ামাদ্রাসা তাঁর অমরকীর্তির স্মৃতি বহন করে চলছে।
(আগামীবারে সমাপ্ত)
চুনতীতে শায়িত আজমগড়ী হযরতের তিন খলিফা
সোমবার জানুয়ারী ৭, ২০১৯
(পূর্ব প্রকাশের পর)
তিনি তাঁর মহান পীর আজমগড়ী হযরতের সাথে হজব্রত পালন করতে আরব ভূমিতে গমন করেছিলেন। তথায় উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আরবীয়গণের সাথে আলাপ আলোচনায় নিজের পীরের সাথে থেকে আরবিতে সহযোগিতার ভূমিকা পালন করতেন।
প্রথমদিকে তিনি বোয়ালখালী কধুরখিল হযরত মাওলানা আবদুল মজিদ (রহ.) এর মুরীদ ছিলেন। পরবর্তীতে আজমগড়ী হযরত (রহ.) এর মুরিদ ও অন্যতম খলিফা ছিলেন। আজমগড়ী হযরত (রহ.) এর একটি বাক্য সর্বমহলে সমধিক প্রচারিত, তা হল ‘মেরে নজীর বে-নজীর হে’।
জীবনের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রামের বাড়ি চলে যান। তথায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের কয়েক দিন আগে শারীরিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাওয়ায় তাঁর থেকে জানতে চাওয়া হয় তাঁর জানাযা কে পড়াবেন?
তখন তিনি বললেন, মাওলানা আবদুস সালাম আরকানী ছাহেব পড়াবেন। এর দু’একদিনের মধ্যে সুদূর আরাকান থেকেহযরত শাহ মাওলানা আবদুস সালাম আরকানী স্থলপথে জীবনে প্রথম চুনতী এসে হাজির হন এবং হযরত শাহ মাওলানা নজির আহমদের বাড়িতে পৌঁছেন নিজের পীর আজমগড়ী হযরতের নির্দেশিত হয়ে। এসব কিছু রুহৃানি বিষয়। আরাকানী হযরত হযরত মাওলানা নজির আহমদকে কয়েকটি ছবক ও তওয়াজ্জু দেন।
অতঃপর জানতে চান কি অবস্থা? তখন তিনি চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, “আই কেলা পাত্রাবাই বাই উরে উড়িগেইগই”। অর্থাৎ আমি কলাগাছের ডগা বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। এখানে দেখতে পেলাম বাগান, স্বর্ণের বাড়ি তথা বেহেশতের পরিবেশ। আরকানী হযরত বলেন, তিনি ছবক দিয়েছিলেন বলে এভাবে উঠতে হল। তাঁর পীর সাহেব কেবলা (আজমগড়ী) ছবক দিলে স্বর্ণের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারতেন। এরপর দ’একদিনের মধ্যে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর কক্ষে রৌশনীময় ও নানান অলৌকিকত্ব প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি এলমে লাদুন্নীর অধিকারীও ছিলেন। ইন্তেকাল কালীন তিনি একমাত্র পুত্র হযরত মাওলানা হাবিব আহমদ (রহ.)ও একমাত্র পুণ্যবতী কন্যা যয়নাব বেগমকে রেখে যান।
হাকিম মাওলানা শাহ মুনীর আহমদ(রহ)
হাকিম মাওলানা আলহাজ্ব কারী শাহ মাওলানা মুনীর আহমদ (রহ.) ( প্রকাশ হাকিম ছাহেব)। আজমগড়ী হযরত তরিকত্বের সফরে চুনতীতে ইউসুফ মঞ্জিলে তাশরীফ রাখতেন। হযরত কাজী মাওলানা ইউসুফ আলী (রহ.)’র বাড়ি বিধায় ইউসুফ মঞ্জিল। তাঁরই সরাসরি নাতি হাকিম মাওলানা মুনীর আহমদ (রহ.)। কাজী মাওলানা ইউসুফ আলী(রহ.) ‘র’ চার পুত্র ,চার কন্যা। হযরত কাজী মাওলানা ইউসুফ আলী (রহ.) ‘র’১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ২য় পুত্র হযরত মাওলানা ছৈয়দ আহমদ (রহ.) ( হযরত শাহ ছাহেব কেবলার পিতা) সাথে নিয়ে হজব্রত পালন করতে গেলে তিনি তথায় ইন্তেকাল করেন।
এতে হযরত শাহ মাওলানা ইউসুফ আলী (রহ.) ‘র’ জমিদারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁরই ১ম সন্তান হযরত মাওলানা ফয়েজ আহমদ (রহ.) ‘র’ উপর। চুনতীসহ এলাকায় সর্বমহলে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র, মুরব্বি ছিলেন, তিনি পৈত্রিক জমিদারী দেখাশুনার নিমিত্তে আরাকান গমন করতেন। তথায় আজমগড়ী হযরতের সাথে মোলাকাত হয়। এতে তাঁর হাতে মুরিদ হয়ে যান। সে হতে হযরত মাওলানা ফয়েজ আহমদ তাঁর পীরকে চট্টগ্রাম তরিক্বতের সফরকালে চুনতীস্থ তাঁদের বাড়িতে তথা ইউসুফ মঞ্জিলে নিয়ে যেতেন। তাঁর ১ম সন্তান হাকিম মাওলানা শাহ মুনীর আহমদ (রহ.)। হযরত মাওলানা ফয়েজ আহমদ ১৯৩০/৩১ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইন্তেকাল করেন।
তিনি ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ২৬ মে চুনতী জন্মগ্রহণ করেন। নিজেদের দেউড়ীর মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর চট্টগ্রাম শহরস্থ মোহসেনিয়া মাদ্রাসা (বর্তমান হাজী মুহসিন কলেজ) উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন তথা ফাজিল পাস করেন। ঐ সময় ঐ মোহসেনিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপল ছিলেন চুনতীস্থ তাঁরই আত্মীয় স্বনামধন্য খান বাহাদুর মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (রহ.)। পরবর্তীতে তিনি তাঁরই একমাত্র কন্যা আনজুমান আরাকে বিবাহ করেন। মোহসেনিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে উপমহাদেশের তৎকালীন শ্রেষ্ঠকারী মাওলানা মুহাম্মদ ইব্রাহীমের কাছে কেরাত শিক্ষা অর্জন করেন। এতে তিনি বিখ্যাত কারী হিসেবে সুনামের অধিকারী হন। অতঃপর ঐ সময় তিনি একটি হেকিমি প্রতিষ্ঠান থেকে ইউনানী ও তিব্বিয়া শাস্ত্রে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি আকিয়াব কাটান। সেখানে বাপ দাদার জমিদারী দেখাশুনা এবং কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৎসাথে সেখানকার শাহী জামে মসজিদের খতিবের দায়িত্বও তাঁর উপর ছিল।
তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ প্রচার বিমুখ। তিনি বুর্জুগী গোপন রাখতে সব সময় সক্রিয় ছিলেন। তবুও তাঁর খবর যারা জানতেন তারা তাঁর কাছে বায়েত গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিলেন। এভাবে তাঁর ছিল অসংখ্য মুরিদান। জনতার ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার অভিপ্রায় তাঁর। অবসর জীবনে বড়সি দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যেত বেশি। মাছ শিকারের সময় প্রায় যিকির দোয়া তজবি পাঠে মশগুল থাকতে দেখা যেত। অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এ মহান সাধককে পর মুখাপেক্ষী হতে দেখা যায়নি কখনও। তাঁর আচার আচরণ ছিল খুবই মধুর এবং জীবন কাটাতেন সব সময় হাস্যেজ্জ্বোল শালীন, রসিকতার মধ্য দিয়ে।
কর্মজীবনে তিনি বেশ কিছু সময় চুনতী হাকিমিয়া আলীয়া মাদরাসার কারীর পদ অলংকৃত করেন। সে সময় চট্টগ্রামের বাঘা বাঘা আলেম তাঁর নিকট কেরাত শিখতে দেখা যেত। তিনি একজন বড় মাপের হেকিম হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিব্বিয়া ও ইউনানী শাস্ত্রে ভাল দখল ছিল। নিজ বাড়িতে প্রস্তুত করেন দামী উপকারী সব ঔষধ। শেষ জীবনে মহান আল্লাহপাকের এবাদতবন্দেগী ও নিজস্ব তৈরি ঔষধে দুস্থ মানুষের সেবা করে দিন অতিবাহিত করতেন। এলাকার ঘরের কাছের মুরব্বি ও সাধারণ মানুষ ইন্তেকাল করলে ওয়ারিশরা তাঁর ইমামতিতে জানাযা পড়াতে বেশি আগ্রহী থাকত। সব দিক দিয়ে সৎ,ধার্মিক,আল্লাহওয়ালা একজন গ্রহণযোগ্য সম্মানি ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ছিল যথেষ্ঠ সুনাম।
জগৎ বিখ্যাত আশেকে রাসূল (স.) হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.) প্রকাশ চুনতী হযরত শাহ ছাহেব কেবলা ছিলেন তাঁর আপন চাচাত ভাই। হযরত শাহ ছাহেব কেবলা তাঁকে বড় ভাই ও কামেল অলি হিসেবে অত্যন্ত ভক্তি করতেন, তাঁর প্রাথমিক জীবনে আজমগড়ী হযরতের হাতে মুরিদ হন। পরবর্তীতে খেলাফত লাভকরেন।
এ মহান অলি ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ২৬ অক্টোবর সোমবার ইন্তেকাল করেন। হযরত শাহ মাওলানা ফজলুল হক (রহ.) ও হযরত মাওলানা নজির আহমদ (রহ.) কবরের পাশে তাঁকে শায়িত করা হয়।
তাঁর খলিফা হচ্ছেন: ১. মাওলানা সাইফুদ্দিন সিদ্দিকী, চুনতী, লোহাগাড়া। ২. হাকিম মাওলানা আবদুস সবুর, চুনতী, লোহাগাড়া।
No comments:
Post a Comment