প্রশ্ন
ধুমপান তথা বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা , জদ্দা,গুল, তামাক ইত্যাদি খাওয়া যাবে কি ?
================================
উত্তর :- ধুমপানের কথা কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও ইজমা-ক্বিয়াস তথা ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবে সুস্পষ্টভাবে মাকরূহ তাহরীমীর কথা ঠিকই উল্লেখ আছে।
আর যেটা ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাবে ধুমপান মাকরূহ তাহরীমীর কথা উল্লেখ আছে
ইজমা-ক্বিয়াস তথা ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবে স্পষ্ট, ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য ফতওয়া মুতাবিক ধুমপান যেখানে মাকরূহ্ তাহ্রীমী, আবার কেউ কেউ হারামও বলেছেন।
“ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহরীমী”
যা ইমামুল হিন্দ, শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর “দূররে ছামীন” কিতাবে, সিরাজুল হিন্দ, শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবে, হযরত আব্দুল হাই লখনভী ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই” কিতাবে এবং
শায়খ ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘হাদীয়াতুল ইমাদী’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। ফতওয়ায়ে আশরাফিয়া কিতাবে ধুমপান আযাবের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া “মাজালিসুল আবরার, শারবুদ্দুখান, আদ্ দুররুল মুনতাক্বা” ইত্যাদি কিতাবেও ধুমপান করা হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মর্তব্য, যে সমস্ত বিষয় শরয়ী দলীলের দ্বারা প্রমাণিত তা অস্বীকার করা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। কেননা এতে প্রকৃতপক্ষে শরীয়ত তথা ইসলামকেই অস্বীকার করা হয়। বিশেষ করে ধুমপানের মাসয়ালাটি ক্বিয়াসী মাসয়ালার অন্তর্ভুক্ত। যার বর্ণনা সরাসরি কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফে উল্লেখ নেই।
তবে ইজমা-ক্বিয়াস তথা ফিক্বাহ ও ফওয়ার কিতাবে উল্লেখ আছে। কেননা ধুমপান তথা বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদি যা তামাক দ্বারা তৈরী হয়।
যার ব্যবহার আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানার অনেক পরে শুরু হয়েছে।
তামাকের ইতিহাস
============
আমেরিকার পাশে “কিউবা” নামক একটি দেশে তামাকের চাষ হতো। সেখান থেকে বাদশাহ্ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে জনৈক রাষ্ট্রদূত ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম তামাক নিয়ে আসে। তখন থেকে এ উপমহাদেশে ধুমপানের সূত্রপাত ঘটে। তামাকের ইতিহাস সম্পর্কে ফিক্বাহ্র সর্বজনমান্য ও বিখ্যাত কিতাব “দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে,
والتتن الذى حدث وكان حدوثه بد مشق فى سنة خمسة عشر بعد الألف.
অর্থঃ- তামাক যা (পরবর্তীতে) নতুনভাবে উৎপাদন হয়েছে। আর উক্ত তামাকের উৎপাদন হয়েছিল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ১০১৫ হিজরী সালে।
“গায়াতুল আওতার” কিতাবের ৪র্থ খণ্ডের ২৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, অর্থঃ তামাক নতুন উৎপাদন আর এর উৎপাদন হয়েছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ১০১৫ হিজরী সালে।
তামাক সম্পর্কে সর্ব প্রথম ফতওয়া প্রদান করেন দ্বাদশ শতকের মুজাদ্দিদ হযরত শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহ্লভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘দুররে ছামীন’ কিতাবে।
তাতে তিনি ধুমপান মাকরূহ তাহ্রীমী বলে ফতওয়া প্রদান করেন এবং তিনিই ধুমপানের সর্বপ্রথম ফতওয়া প্রদানকারী।
তাঁর পরে ফতওয়া দেন তাঁর ছেলে হযরত শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবে।
শায়খ ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘হাদীয়াতুল ইমাদী’ কিতাবে ধুমপান করাকে মাকরূহ তাহরীমী ফতওয়া দেন।
যা ছহীহ্ হাদীছ শরীফ থেকে ক্বিয়াস করে প্রদান করা হয়েছে এবং এটাই ছহীহ্ ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়া। যার উপর উলামায়ে হক্কানী-রব্বানীগণ একমত।
হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
من اكل هذه الشجرة المنتنة فلا يقربن مسجدنا فان الملائكة تتأذى مما يتأذى منه الانس.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি এমন দুর্গন্ধযুক্ত বৃক্ষের (কাঁচা পিঁয়াজ বা রসূনের) কিছু খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটেও না আসে। নিশ্চয়ই যে কারণে মানুষ কষ্ট পায় তা ফেরেশ্তাগণেরও কষ্টের কারণ। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত)
হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে,
نهى عن هاتين الشجرتين يعنى البصل والثوم وقال من اكلهما فلا يقربن مسجدنا وقال ان كنتم لابد اكلهما فاميتوهما طبخا.
অর্থঃ- হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দু’টি বস্তু অর্থাৎ পিঁয়াজ ও রসূনঞ্জখেতে নিষেধ করেছেন। এবং বলেছেন, “যে ব্যক্তি তা খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের নিকটেও না আসে।” তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের যদি খেতেই হয়, তাহলে তা রান্না করে দুর্গন্ধ বিনষ্ট করে খাবে।” (আবূ দাউদ, মিশকাত)
উল্লিখিত হাদীছ শরীফের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত মাওলানা কুতুবুদ্দীন খান দেহ্লভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যে সকল দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু দ্বারা মানুষের কষ্ট হয়, তা দ্বারা ফেরেশ্তাগণেরও কষ্ট হয়।” (মুযাহিরে হক্ব)
সুতরাং কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসূন, গাজর, মূলা এবং এ জাতীয় যে সমস্ত কাঁচা দ্রব্য খেলে মুখে দুর্গন্ধ হয়, সেটা খাওয়া মাকরূহ্ তান্যীহী এবং সেটা খেয়ে মসজিদে যাওয়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী।
এ মাসয়ালার উপর ক্বিয়াস করে ধুমপান করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী এবং ধুমপান করে মসজিদে যাওয়া হারাম ফতওয়া প্রদান করা হয়েছে। কেননা কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসুন খাওয়া অপেক্ষা ধুমপানে মুখ অনেক বেশী দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।
নিম্নে ধুমপান মাকরূহ তাহরীমী সম্পর্কে সর্বজনমান্য ও বিশ্বখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব থেকে শরীয়তের সুস্পষ্ট দলীল-আদিল্লাহ পেশ করা হলো।
যেমন, সর্বজনমান্য ও বিশ্বখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব “দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে,
وقد كرهه شيخنا العمادى فى هديته الحاقا له بالثوم والبصل.
অর্থঃ- আমাদের শায়খ হযরত ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “হাদিয়া কিতাবে” রসূন ও পিঁয়াজের সাথে ক্বিয়াস করে তামাক (ও তামাক দ্বারা প্রস্তুতকৃত বিড়ি সিগারেটের ধুমপান ইত্যাদি) মাকরূহ তাহ্রীমী বলেছেন।
“গায়াতুল আওতার” কিতাবের ৪র্থ খণ্ডের ২৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
অর্থঃ আমাদের উস্তায হযরত ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘হাদীয়াতুল ইমাদী’ কিতাবে তামাককে রসূন পিঁয়াজের সাথে ক্বিয়াস করে তামাককে মাকরূহ তাহরীমী বলেছেন।
ধুমপান প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আযীযী” কিতাবের ৫৯৬, ৫৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে
অর্থঃ- “হুক্কা পান করা হালাল কি হারাম এ ব্যাপারে ইখ্তিলাফ বা মতবিরোধ রয়েছে, তবেঞ্জঅধিক বিশুদ্ধ মত এই যে, হুক্কা পান করা মাকরূহ তাহ্রীমী।”
“ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই লখনভী” কিতাবের ৫০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
অর্থঃ- “সিগারেট পান করা হুক্কা পান করার মতই মাকরূহ্ তাহরীমী।” “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৪৬০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ظاهر كلام العمادى انه مكروه تحريما.
অর্থঃ- সুস্পষ্ট বর্ণনা মতে ধুমপান করা মাকরূহ তাহরীমী।
“ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, وبعضهم قال بحرمته.
অর্থঃ- “কেউ কেউ ধুমপান করা হারাম বলেছেন।”
“ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে,
وقد أفتى بالمنع من شربه.
অর্থঃ- আমাদের মাশায়িখে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ফতওয়া দিয়েছেন যে, ধুমপান করা নিষিদ্ধ।
এছাড়াও ধুমপান মাকরূহ্ তাহ্রীমী হওয়ার ব্যাপারে নিম্নোক্ত কারণসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে-
(১) বিড়ি, সিগারেটে ‘নিকোটিন’ রয়েছে। যেটা পান করা বিষ পানের নামান্তর।
(২) চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। (৩) ধুমপানে আর্থিক অপচয় হয়। কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان المبذرين كانوا اخوان الشيطين.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা বণী ইস্রাঈল/২৭)
(৪) ধুমপানে আগুনের ধোঁয়া মুখের ভিতর প্রবেশ করানো হয়, যা জাহান্নামীদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়।
(৫) ধুমপান বিধর্মীদের প্রচলিত অভ্যাস। ধুমপানে তাদের তাশাব্বুহ হয়। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখবে, তাদের সাথেই তার হাশর-নশর হবে।”
(৬) ধুমপানে মানুষ ও ফেরেশ্তাদের কষ্ট হয়। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
ايذاء المسلم كفر.
অর্থঃ- “মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া কুফরী।”
(৭) ধুমপানে নেশার সৃষ্টি হয়। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, كل مسكر حرام
অর্থঃ- “সমস্ত নেশাজাতীয় দ্রব্যই হারাম।”
এছাড়াও আরো শতসহস্র কারণ রয়েছে।
কারণ কাঁচা পিঁয়াজ, কাঁচা রসুন বা এ জাতীয় সাধারণ গন্ধযুক্ত খাদ্যদ্রব্য খাওয়া যেখানে মাকরূহ্ তান্যীহী, সেখানে ধুমপান তথা বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদি মারাত্মক দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্য
সুতরাং ধুমপান সম্পর্কে শরীয়তের মূল ফতওয়া হচ্ছে- মাকরূহ্ তাহ্রীমী। কেউ কেউ হারাম ফতওয়াও দিয়েছেন।
উপরোক্ত শরীয়তের সুস্পষ্ট দলীল-আদীল্লাহ্র ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, ধুমপান করা মাকরূহ তাহরীমী বা নিষিদ্ধ। সুতরাং ধুমপান করা যেমন মাকরূহ তাহরীমী বা নিষিদ্ধ অনুরূপ ধুমপান তথা বিড়ি-সিগারেট বিক্রয় করাও মাকরূহ তাহরীমী বা নিষিদ্ধ। যেমন, “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ويمنع من بيع الدخان وشربه.
অর্থঃ- ধুমপানের ক্রয় বিক্রয় উভয়ই নিষিদ্ধ।
No comments:
Post a Comment