ভারতে শায়িত হযরত শাহ মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)
সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, দৈনিক পূর্বকোণ
হিজরি ১২৬৩, বাংলা ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ ভারতের হুগলী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মহান পিতার নাম হযরত আলহাজ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মুক্তাদির। মাতার নাম মোছাম্মৎ মহব্বতুননেছা। মাত্র ৯ মাস বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। তিনি সিদ্দিকী বংশের ৩০তম বংশধর।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর শীজপুর, হুগলী এবং কলকাতার বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে জমাতে উলা পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অতঃপর হযরত ছৈয়দ আহমদ বেরলভীর খলিফা কলকাতা হযরত মাওলানা হাফেজ জামাল উদ্দীন (রহ.)’র নিকট হাদীস ও তাফসীরে আরও জ্ঞান লাভ করেন। তিনি ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে হজ ও যেয়ারতের উদ্দেশ্যে পবিত্র আরব ভূমিতে গমন করেন। সেখানে হাদীস শরীফের সনদ লাভ করেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুর্লভ কিতাবাদি সংগ্রহ করতে থাকেন। দীর্ঘ ১৮ বছর গবেষণায় কাটান। মাত্র ২৩/২৪ বছরের মধ্যে এলমের সাগরে পরিণত হন। ফুরফুরা কলকাতা থেকে মাত্র ৪০/৫০ কি.মি. দূরত্বে। এ কলকাতা নগরীতে সপরিবারে থাকতেন রসূল নোমা হযরত শাহ সুফি ছৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) বিশ্ববিখ্যাত মহান ওলি ও তরিকতের শেখ হযরত শাহসুফি ছৈয়দ ফতেহ আলীর হাতে তরিকতে দাখিল হন। যা তাঁর জীবনে বড় সৌভাগ্য। তিনি ফানাফীর শেখের স্তরে উপনীত হন । পীরের সঙ্গ ছাড়া তিনি অসস্থিবোধ করতেন। জ্ঞানের সাগর হয়েও ওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে পীরের খেদমতে থেকে এলমে তাসাউফ অর্জনে নিবেদিত থাকেন। তাঁর পীর ভাই হযরত ইকরামুল হক (রহ.) বলেন, “একদিন পীর ছাহেব বললেন, বাবা আবু বকর! তুমি মহিউস সুন্নাহ ও আমিরুস শরীয়ত হবে”। পীরের এ দোয়া অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) ছিলেন শরীয়তের যাবতীয় সকল মান্যকারী পীর। তাঁর আখলাক ও তাকওয়া জ্বলন্ত প্রমাণ। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) সকল অবস্থাতেই সর্বসাধারণের সাথে খোশহালে মিশতেন। লোকজনের সাথে তাদের যোগ্যতা অনুসারে কথা বলতেন। তাঁর নিকট কেউ গোপন কথা বলতে ইচ্ছে করলে তিনি তাদের সময় করে দিতেন। কেউ কোন প্রশ্ন করলে এরূপভাবে উত্তর দিতেন যে, তাতে উপস্থিত মজলিসের আলেম ও সাধারণ মানুষ খুশি হয়ে যেতেন।
তিনি কারও শরীয়তের খেলাপ দেখলে রাগ সহকারে ধমক দিতেন। পর মুহূর্তেই আবার তাঁর বালকসুলভ সরলতায় তাকে মিষ্ট বাক্যে তুষ্ট করে দিতেন। তাঁর নিকট থেকে কেউ নাখোশ হয়ে ফিরে যেত না। তিনি অনেক সময় ভীত শংকিত লোকের উপর নছিহত করতেন না। তিনি একজনের সাথে এমনভাবে কথা বলতেন যে, অপরজন তা হৃদয় ঙ্গম করে সংশোধিত হয়ে যেত। তিনি ছিলেন অতিশয় দয়ালু ও দানশীল। তাঁর দ্বারা গরীব মিসকিন প্রতিপালিত হত। তিনি আল্লাহ পাকের উপর অতিশয় নির্ভরশীল থাকতেন। অতি সাধারণ লোকজনও তার নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি আগ্রহ করে তার জবাব দিতেন। বিরোধবাদীরা তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তিনি সাদরে আলিঙ্গন করে ভুল ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করতেন।
কারও ইন্তেকালের সংবাদ শুনলে তার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা তার বিশেষ আদব ছিল। বহু অমুসলিম তাঁর ওয়াজে মাহফিলে আগ্রহ সহকারে গমন করত। যুক্তিপূর্ণ ওয়াজ শুনে মুগ্ধ হয়ে যেত। অবশেষে কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করত। এদের মধ্যে অনেকে আল্লাহর ওলি হয়ে গেছেন। তিনি বদদোয়া কি বুঝতেন না।
তাঁর মহান পীর রসূল নোমা হযরত শাহসুফি ছৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)’র পরিবারবর্গ বংশধরকে অতিশয় তাযিম করতেন। অতি আদরের সহিত তাঁদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। তাঁর জোরে হাসার অভ্যাস ছিল না। হাসির কারণ হলে তিনি মুচকি হাসতেন।
তাঁর দরবারে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা থাকত। এতে মানুষের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন দপ্তরে ভাগ করা ছিল। সেই ব্রিটিশ আমলে তিনি বাংলাসহ ভারতবর্ষের মুসলমানদের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তৎমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ওয়াজ-নসিহত, কিতাবাদি প্রকাশ, সংবাদপত্রসহ নানাভাবে প্রচারণা চালানো । ঐ সময় বাংলায় তাঁর মত ওয়াজ-নসিহতে তুলনা হবার ব্যক্তি আছে বলে মনে করা যায় না। হাজার হাজার লোক তার ওয়াজ-নসিহত শুনে মোহিত হয়ে যেতেন। তিনি অসংখ্য কিতাবাদি লিখেন, প্রকাশ করেন। যা প্রায় ৩ শতের অধিক।
তাঁর দরবার হতে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন প্রকাশ যা বর্তমানেও আছে। তিনি আলেমগণ নিয়ে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বড় ধরনের সংগঠন গড়ে তুলেন। ব্রিটিশদের নানান ধর্মবিরোধী কাজে বাংলার বাঘ হিসেবে ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯২৬/২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাংলার আসামে তাঁর জিহাদী ভূমিকা ভাববার বিষয়। সেই ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের আচার আচরণ পোশাক-পরিচ্ছেদ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। ফলে বাংলা, আসামে কোটি কোটি মুসলমান এর প্রতিফল পেতে থাকেন। তিনি থিয়েটার হলে ওয়াজ, মিলাদ মাহফিলের বিরুদ্ধে কঠোর ছিলেন।
হযরত শাহ মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম হজব্রত পালন করেন। ১৩৩০ হিজরি তথা ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সহ¯্রাধিক খলিফা, মুরিদ ভক্তসহ ২য় বার মুম্বাই থেকে জাহাজে করে হজে গমন করেন। পবিত্র আরব ভূমিতে হজ ও যেয়ারতে আসা আলেম, সুফি দরবেশগণ তাঁর মোলাকাত পেতে তৎপর ছিলেন। পবিত্র দুই নগরীতেও তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানাদিতে ওয়াজ-নসিহত করতেন। তিনি একজন পীর হয়েও যে সমস্ত তরিকতের দরবারে শরীয়ত দুর্বল প্রকাশ্যে তাদের কঠোর সমালোচনা করতেন।
তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া যা হযরত শাহ ছৈয়দ আহমদ (রহ.) থেকে আমাদের এ ভারতবর্ষে ও বাংলায় প্রচলিত। তার বিস্তারিত পরিচয় আল কওলুস সাবিত ও যাদুত তাকওয়া কিতাব দ্বয়ে উল্লেখ আছে বলেন।
তিনি লা-মাজবাহী তথা ওহাবী মতবাদকে খুবই অপছন্দ করতেন। যে কোন মাজারে শরিয়তবিরোধী কাজ হলে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেন। তিনি সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের নিকট পত্র লিখেন আহলে বায়েত আওলাদে রসুল মহান সাহাবাগণের মাজারসমূহ ভেঙ্গে ফেলা, দাড়িমুন্ডন বা ছোট করার বিষয়ে। এসব বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত ধর্মসম্মত নয় বলে তিনি বাদশাহ আবদুল আজিজের নিকট পত্র পাঠান। বাদশাহ আবদুল আজিজও উক্ত পত্রের জবাবে এসব কাজ তিনি না করছেন উল্লেখ করেন। তিনি যেয়ারতের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে গমন করতেন। তৎমধ্যে আজমীর ও সেরহিন্দ অন্যতম। তাঁর মাধ্যমে ভারতবর্ষে হাজার হাজার মসজিদ, মকতব, খানকাহ, হেফজখানা, এতিমখানা, ফাজিল, কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তৎমধ্যে ৮‘শ’ বড় বড় মাদ্রাসা তাঁর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাঁর করামত (কেরামত/কারামত) ভান্ডার বিশাল। তাঁর জীবনীতে ৫৫২ জন খলিফার নাম উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর মহান পীর রসূল নোমা হযরত ছৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)’র পরবর্তী তাঁর খলিফাগণের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। বিশেষ করে ফুরফুরা শামসুল ওলামা হযরত শাহসুফি গোলাম সালমানী (রহ.)ও তাঁর মহান পীরের খলিফা। তাঁরা আপন মামা ফুফাত ভাই। তাঁদের উভয়ের কবর মাত্র ১ কি.মি ব্যবধানে।
কলকাতায় বসবাসকারী হযরত ছৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.)’র সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। উভয়ের মধ্যে সময়ে সময়ে মোলাকাত হত। মোলাকাতে আলাপ হয়, যে আগে ইন্তেকাল করবে তাঁর জানাযা অপরজন পড়াবেন। এতে আবু বকর সিদ্দিক (রহ.) জানতে চান আপনি আগে ইন্তেকাল করলে আমি কিভাবে বুঝব। তখন ছৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.) বলেন, “আমি ইন্তেকাল হওয়ার সাথে সাথে আপনার মাথার টুপি পড়ে যাবে”। বাস্তবেও হযরত ছৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.) ইন্তেকাল করলে, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রহ.)’র টুপি পড়ে য়ায়। কলকাতা শহরে ছৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.)’র জানাযা পড়ালেন।
তাঁর ওছিয়তনামার মধ্যে অন্যতম হল হালাল রোজগারে থাকা, শরীয়ত শতভাগ মেনে চলা, মহিলাগণের পর্দার ব্যাপারে কঠোর থাকা, তরিকতের আমল রক্ষা করে, শরীয়ত মেনে চলা। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ ১৭ মার্চ বাংলা ১৩৪৫ সনের ৩ চৈত্র, হিজরি ১৩৫৮ সালে শুক্রবার সুবহে সাদেকের সময় বিশ্ববিখ্যাত এ মহান ওলি ইন্তেকাল করেন। ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
পরদিন শনিবার বাদ মাগরিব তাঁর দাফন কার্য সম্পাদন হয়। প্রায় শতের কাছাকাছি বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ফুরফুরায় মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাসহ তথা বিশাল ইসলামী জংশনের মধ্যে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত।
No comments:
Post a Comment