Wednesday, 5 May 2021

সাদকাতুল ফিতর অর্ধ সা'

 সাদাকাতুল ফিতরে আধা সা' গম : প্রামাণ্য একটি পর্যালোচনা


আমাদের দেশের কিছু ভাইদের দেখা যায়, ইদুল ফিতরের সময় সন্নিকটে হলেই জোরেসোরে প্রচার শুরু করে যে, সাদাকাতুল ফিতর আবশ্যিকভাবে এক সা’ দ্বারা আদায় করতে হবে; চাই গম হোক বা অন্য কোনো খাবার জাতীয় বস্তু হোক। জোর দাবি করে বলে যে, এক সা’র কমে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করলে তা আদায় হবে না। মূলত তাদের উদ্দেশ্য থাকে, আমাদের দেশে যারা আধা সা’ গমের দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে, তাদের বিরোধিতা করা এবং নিজেদের মত অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া।


আমরা এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করেছি। পক্ষে-বিপক্ষের সব হাদিস যাচাই করে দেখার সুযোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, সাদাকাতুল ফিতর মূলত দুভাবেই আদায় করা যায়। কিছু খাদ্যের ক্ষেত্রে আধা সা’ হওয়াই যথেষ্ট, আর বাকি কিছু খাদ্যের ক্ষেত্রে এক সা’ হওয়া জরুরি। হাদিসের ভাষ্য থেকে জানা যায়, সাদাকাতুল ফিতর পাঁচ ধরনের খাদ্যের দ্বারা আদায় করা যায়। যথা : খেজুর, কিসমিশ, পনির, যব ও গম। এ পাঁচটি প্রকারের যেকোনো একটি দ্বারা আদায় করলেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। তবে প্রথম চার প্রকার খাবার তথা খেজুর, কিসমিশ, পনির, জব দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের জন্য এক সা’ নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেমন সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে :

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ وَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: وَكَانَ طَعَامَنَا الشَّعِيرُ وَالزَّبِيبُ وَالأَقِطُ وَالتَّمْرُ

‘আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ইদুল ফিতরের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর স্বরূপ দিতাম। আবু সাইদ রা. বলেন, আমাদের খাদ্য ছিল- যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর।’ (সহিহুল বুখারি : ২/১৩১, হা. নং ১৫১০, প্রকাশনী : দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)


এ হাদিসে পঞ্চম প্রকার খাবার তথা গমের দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু অন্য হাদিসে গমের দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের জন্য আধা সা’ নির্ধারণ করা হয়েছে। তো সমস্যা হয়েছে, যারা শুধু প্রথম চার প্রকারের হাদিসগুলো দেখেছে, পঞ্চম প্রকারের জন্য আলাদা হাদিস দেখেনি বা খুঁজে পায়নি, তারা প্রথম চার প্রকারের খাবারের হাদিসের ওপর ভিত্তি করে প্রচার করছে যে, যে খাবারের দ্বারাই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হোক না কেন, সর্বদা এক সা’র দ্বারাই আদায় করতে হবে। এক সা’র হাদিসটি গমের জন্য প্রযোজ্য না হলেও তারা প্রথম চার প্রকারের খাদ্যের ওপর কিয়াস করে গমের ক্ষেত্রেও একই বিধান আরোপ করেছে। বস্তুত তারা আধা সা’র হাদিস খুঁজে পায়নি; এজন্যই প্যাঁচ বেঁধেছে। অথচ আধা সা’ গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার ব্যাপারে একাধিক সহিহ ও হাসান হাদিস রয়েছে। এছাড়াও এর পক্ষে অনেক আসারে সাহাবা ও তাবিয়িনও বিদ্যমান, যার প্রামাণ্যতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। 


এ পর্যায়ে আমরা এখন আধা সা’ গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার ব্যাপারে কতিপয় প্রমাণযোগ্য হাদিস ও আসার উল্লেখ করছি। আশা করি, এগুলো দেখার পর আধা সা’ গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার ব্যাপারে আর কারও কোনোরূপ সংশয় থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।


মুসনাদু আহমাদে হাসান সনদে একটি সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে :

حَدَّثَنَا عَتَّابُ بْنُ زِيَادٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ يَعْنِي ابْنَ الْمُبَارَكِ قَالَ: أَخْبَرَنَا ابْنُ لَهِيعَةَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ نَوْفَلٍ عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ الْمُنْذِرِ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ قَالَتْ: كُنَّا نُؤَدِّي زَكَاةَ الْفِطْرِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ بِالْمُدِّ الَّذِي تَقْتَاتُونَ بِهِ

‘আসমা বিনতে আবি বকর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমাদের ব্যবহৃত বর্তমানের মুদের হিসেবে আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে দুই মুদ বা আধা সা’ গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম।’ (মুসনাদু আহমাদ : ৪৪/৫০১ হা. নং ২৬৯৩৬, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)


বিদগ্ধ হাদিস বিশারদ শাইখ শুয়াইব আরনাউত রহ. বলেন :

حديث صحيح وهذا إسناد حسن

‘এটা সহিহ হাদিস, অবশ্য এর সনদ হাসান।’ (প্রাগুক্ত)


কাজি আহমাদ শাকির রহ. বলেন :

إسناده حسن

‘এর সনদ হাসান।’ (মুসনাদু আহমাদ [তা’লিক] : ১৮/৩৭০ হা নং ২৬৮১৫, প্রকাশনী : দারুল হাদিস, কায়রো)


হাফিজ হাইসামি রহ. বলেন :

رجاله رجال الصحيح

‘এর বর্ণনাকারীগণ সবাই সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ : ৩/২৩২, হা নং ৪৪৪১, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)


সুতরাং প্রমাণযোগ্য এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলো যে, আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার প্রচলন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেই বিদ্যমান ছিল।


মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাকে শক্তিশালী সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :

عَبْدُ الرَّزَّاقِ عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ ثَعْلَبَةَ قَالَ: خَطَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّاسَ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ فَقَالَ: أَدُّوا صَاعًا مِنْ بُرٍّ أَوْ قَمْحٍ بَيْنَ اثْنَيْنِ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى كُلِّ أَحَدٍ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ

‘আব্দুল্লাহ বিন সালাবা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইদুল ফিতরের এক কিংবা দুদিন পূর্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, তোমরা দুজনের পক্ষ থেকে এক সা’ গম কিংবা ছোট বড় প্রত্যেকের পক্ষ থেকে এক সা’ খেজুর বা যব সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করে দাও।’ (মুসান্নাফু আ. রাজ্জাক : ৩/৩১৮, হা. নং ৫৭৮৫, প্রকাশনী : আল মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত)


এ হাদিসটির সনদের অবস্থা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তা সহিহ। হাদিসটির বর্ণনাকারীগণ তথা আব্দুর রাজ্জাক রহ., ইবনু জুরাইজ রহ. ও ইবনু শিহাব জুহরি রহ. তিনজনই হাদিসশাস্ত্রের স্বীকৃত ও সুপ্রসিদ্ধ ইমাম। হাদিসের ময়দানে তাঁদের বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। এ কারণেই বিখ্যাত হাফিজে হাদিস জাইলায়ি রহ. এ হাদিসটির মান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :

وهذا إسناد صحيح قوى

‘এটা একটি শক্তিশালী বিশুদ্ধ সনদ।’ (নাসবুর রায়া : ২/৪০৭, হা. নং ৩৬১২, শাইখ আওয়ামা কতৃক তাহকিককৃত, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রাইয়ান, বৈরুত)

অর্থাৎ তিনি শুধু ‘বিশুদ্ধ’ বলেই ক্ষান্ত হননি; বরং তার সাথে ‘শক্তিশালী’ বিশেষণও যুক্ত করেছেন। 


এ হাদিসে এক সা’ গমে দুজনের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং পরিষ্কারই বুঝা যায় যে, একজন ব্যক্তির জন্য আধা সা’ গম নির্ধারণ করা হয়েছে। আর খেজুর বা যব হলে প্রত্যেকের জন্যই এক সা’ দিতে হবে। 


সুনানুন নাসায়ি-তে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :

عَنْ الْحَسَنِ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ خَطَبَ بِالْبَصْرَةِ فَقَالَ: أَدُّوا زَكَاةَ صَوْمِكُمْ. فَجَعَلَ النَّاسُ يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ. فَقَالَ: مَنْ هَاهُنَا مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ؟ قُومُوا إِلَى إِخْوَانِكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ. فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَضَ صَدَقَةَ الْفِطْرِ عَلَى الصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ وَالْحُرِّ وَالْعَبْدِ وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ

‘হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণিত, ইবনু আব্বাস রা. বসরা শহরে ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, তোমরা তোমাদের রোজার জাকাত তথা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করো। এতে লোকজন (অবাক হয়ে) পরস্পরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। তখন তিনি (বিষয়টি বুঝতে পেরে) বললেন, এখানে মদিনার অধিবাসী কে কে আছ? তোমরা তোমাদের ভাইদের কাছে যাও এবং তাদের দ্বীনি ইলম শিক্ষা দাও। যেহেতু তারা জানে না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট-বড়, স্বাধীন-দাস, পুরুষ-মহিলা সবার ওপর আধা সা’ গম কিংবা এক সা’ খেজুর বা যব (সাদাকাতুল ফিতর দেওয়া) আবশ্যক করেছেন।’ (সুনানুন নাসায়ি : ৩/১৯০, হা. নং ১৫৮০, প্রকাশনী : মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব)


শাইখ শুয়াইব আরনাউত রহ. এর রাবিদের ব্যাপারে বলেন :

رجاله ثقات رجال الشيخين

‘এর রাবিগণ সিকা তথা নির্ভরযোগ্য। সবাই বুখারি, মুসলিমের রাবি।’ (মুসনাদু আহমাদ [তা’লিক] : ৫/৩২৩ হা. নং ৩২৯১, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)


শাইখ আলবানি রহ. এ হাদিসটির ব্যাপারে বলেন :

صحيح المرفوع

‘সহিহ মারফু হাদিস।’ (সুনানুন নাসায়ি : পৃষ্ঠা নং ১৮৬, হা. নং ১৫৮০, শাইখ আলবানির তাহকিককৃত, প্রকাশনী : বাইতুল আফকার, রিয়াদ)


কাজি আহমাদ শাকির রহ. বলেন :

إسناده صحيح

‘এর সনদ সহিহ।’ (মুসনাদু আহমাদ [তালিক] : ৩/৪০০ হা. নং ৩২৯১, প্রকাশনী : দারুল হাদিস, কায়রো)


এ হাদিসটির ব্যাপারে অনেকের অভিযোগ হলো, হাদিসটি মুনকাতি’ বা সূত্রবিচ্ছিন্ন। তাদের দাবি হলো, হাসান বসরি রহ. ইবনু আব্বাস রা.-এর সময়ের লোক হলেও পরস্পরে তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং ইবনু আব্বাস রা. থেকে হাসান বসরি রহ.-এর বর্ণিত হাদিস মুনকাতি’ বা সূত্রবিচ্ছিন্ন হওয়ায় এ হাদিসটি জইফ বলে বিবেচিত হবে। 


আমরা বলব, তারা হাদিসটিকে মুনকাতি’ সাব্যস্ত করে জইফ প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাদিসটি মুনকাতি’ নয়। কেননা, হাদিসটিকে মুনকাতি’ বলার মূল ভিত্তি ছিল ইবনু আব্বাস রা. থেকে হাসান বসরি রহ.-এর সরাসরি কোনো বর্ণনা না থাকা। অর্থাৎ তাদের পারস্পরিক কোনো দেখা-সাক্ষাৎ প্রমাণ না হওয়ায় ইবনু আব্বাস রা. থেকে তার বর্ণনাকে মুনকাতি’ বলে হাদিসকে জইফ বলা হচ্ছিল। কিন্তু আমরা মুসনাদু আবি ইয়ালাতে এমন একটি হাদিস পেয়েছি, যেখানে ইবনু আব্বাস রা. থেকে হাসান বসরি রহ.-এর কারও মাধ্যম ছাড়া সরাসরি হাদিস শোনা ও বর্ণনা করার প্রমাণ পাওয়া যায়।


বর্ণনাটি নিম্নরূপ :

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي غَنِيَّةَ، عَنْ دَاوُدَ بْنِ عِيسَى، عَنِ الْحَسَنِ قَالَ: أَخْبَرَنِي ابْنُ عَبَّاسٍ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: اللَّهُمَّ إِنِّي حَرَّمْتُ الْمَدِينَةَ كَمَا حُرِّمَتْ مَكَّة 

‘হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে ইবনু আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, হে আল্লাহ, আমি মদিনাকে হারাম ঘোষণা করলাম; যেমনই আপনি মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।’ (মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৪/৪০২, হা. নং ২৫২৪, প্রকাশনী : দারুল মামুন লিত্তুরাস, দিমাশক)


এ বর্ণনা থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, হাসান বসরি রহ.-এর সাথে ইবনু আব্বাস রা.-এর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং হাসান বসরি রহ. তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। উলুমুল হাদিসের ব্যাপারে অবগত ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, হাদিসের পরিভাষায় أخبرنى (আমাকে বর্ণনা করেছেন) এমন একটি দ্ব্যার্থবোধক শব্দ, যা উসতাদ থেকে সরাসরি বর্ণনা করাকে বুঝায়। এখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যমে বর্ণনা করার কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো রাবি কারও থেকে বাস্তবিকই হাদিস না শুনে থাকে আর বর্ণনা করার সময় أخبرنى (আমাকে বর্ণনা করেছেন) বলে তাহলে সে মুহাদ্দিসদের নিকট كذاب বা মিথ্যুক বলে পরিগণিত হয় এবং তার কোনো বর্ণনাই আর প্রমাণযোগ্য থাকে না; বরং আগে-পরের তার সব বর্ণনাই বাতিল হয়ে যায়। হ্যাঁ, যদি عن (যার অর্থ ‘থেকে’) শব্দ দ্বারা বর্ণনা করে তাহলে আর তা দ্ব্যার্থবোধক হয় না; বরং সেখানে সরাসরি শোনা কিংবা তৃতীয় কোনো মাধ্যমে শোনা উভয়টারই সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু أخبرنى বললে কেবল সরাসরি শোনাকেই বুঝায়, তৃতীয় কোনো মাধ্যমে শোনাকে বুঝায় না।


মোটকথা, হাসান বসরি রহ. ইবনু আব্বাস রা. থেকে হাদিসটি أخبرنى শব্দ দিয়ে বর্ণনা করায় এ কথা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইবনু আব্বাস রা.-এর সাথে হাসান বসরি রহ.-এর সাক্ষাৎ ও সরাসরি বর্ণনা করার বিষয়টি প্রমাণিত। অন্যথায় اخبرنى বলায় হাসান বসরি রহ.-কে মিথ্যুক বলা ও তার সব বর্ণনা বাতিল হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়, যা অসম্ভব ও অকল্পনীয় একটি বিষয়। 


সুতরাং যখন সাব্যস্ত হলো যে, ইবনু আব্বাস রা.-এর সাথে হাসান বসরি রহ.-এর সাক্ষাৎ হয়েছে তখন এতে সূত্রবিচ্ছিন্নতার যে অভিযোগ করা হয়েছিল তা দূর হয়ে হাদিসটি সহিহ বলে প্রমাণিত হলো। আর যারা ইবনু আব্বাস রা.-এর সাথে হাসান বসরি রহ.-এর সাক্ষাৎ ও তার বর্ণনা করাকে অস্বীকার করেছেন তাদের নিকট হয়তো মুসনাদু আবি ইয়ালার এ হাদিসটি পৌঁছেনি। আর এটা স্বাভাবিক বিষয় যে, কেউ যত বড় আলিম ও ইমামই হোক না কেন, তার সব হাদিস জানা থাকা আবশ্যক নয়; বরং সম্ভবও নয়। তাই তাদের ওপর আমাদের কোনো আপত্তি ও অভিযোগ নেই। অভিযোগ থাকবে কেবল তাদের ওপর, যারা প্রকৃত সত্য জানার পরও গোয়ার্তুমি ও পক্ষপাতিত্ব করবে।


মারাসিলু আবি দাউদে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে :

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْجَرَّاحِ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي حَفْصَةَ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ قَالَ: أَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ بِمَعْنَاهُ (يعنى مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ

‘সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর দিতে নির্দেশ প্রদান করেছেন।’ (মারাসিলু আবি দাউদ : পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬, জাকাতুল ফিতর অধ্যায়, প্রকাশনী : দারুল কলাম, বৈরুত)


এরপর ভিন্ন একটি সনদে বলেন : 

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ عَمْرِو بْنِ الْحَارِثِ عَنْ يَزِيدَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قُسَيْطٍ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَضَ زَكَاةَ الْفِطْرِ مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ

‘সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতর (হিসেবে) আধা সা’ (পরিমাণ) গম নির্ধারণ করেছেন।’ (প্রাগুক্ত)


ইমাম আবু দাউদ রহ. প্রথম হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন :

مسندًا وهذا أصح

‘হাদিসটি মুসনাদ (ধারাবাহিক সনদযুক্ত হাদিস) হিসেবে বর্নিত হলেও এটা (মুরসাল হাদিস হিসেবেই) অধিক বিশুদ্ধ।’ (প্রাগুক্ত)


হাফিজ আবু আব্দিল্লাহ মাকদিসি রহ. বলেন :

وأما حديث سعيد بن المسيب الذى رواه أبو داءد فإسناده صحيح كألشمس لكنه مرسل ومرسل سعيد حجة

‘আর সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ.-এর হাদিস, যা ইমাম আবু দাউদ রহ. (স্বীয় মারাসিলে) বর্ণনা করেছেন, তার সনদ সূর্যের (কিরণের) মতো স্পষ্টভাবেই বিশুদ্ধ, তবে তা মুরসাল। আর (মুহাদ্দিসদের নিকট) সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ.-এর মুরসাল প্রমাণযোগ্য।’ (তানকিহুত তাহকিক ফি আহাদিসিত তা’লিক : ৩/১২৮ হা. নং ১৬২৬ সংশ্লিষ্ট, মাসআলা নং ৩৩৪, প্রকাশনী : আজওয়াউস সালাফ, রিয়াদ)


ইমাম ইবনু দাকিক আল-ইদ রহ. বলেন :

فالسند كله رجال الصحيح ومراسيل سعيد اشتهر تقويتها

‘সুতরাং সনদের সবগুলো রাবি সহিহ হাদিসের রাবি। আর সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ.-এর মুরসালের শক্তিমত্তা সুপ্রসিদ্ধ।’ (নাসবুর রায়া : ২/৪২৩, হা. নং ৩৬৬৬, শাইখ আওয়ামা কর্তৃক তাহকিককৃত, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রাইয়ান, বৈরুত)


এ ছিল মারফু হাদিসের বিবরণ। তন্মধ্য হতে আমরা এখানে মাত্র কয়েকটি মারফু হাদিস উল্লেখ করেছি। নচেৎ এসংক্রান্ত আরও অনেক মারফূ হাদিস আছে, যা সহিহু ইবনি খুজাইমা, সুনানুল বাইহাকি, সুনানুদ দারাকুতনি, সুনানু আবি দাউদ, মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা, মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক, শারহু মাআনিল আসার, আল-আওসাতসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদিসের গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত হয়েছে। 


আর আসার তথা সাহাবা ও তাবিয়িনের বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা শুরু করলে তো একটা ছোটখাট রিসালাই তৈরি হয়ে যাবে। এ ছোট্ট পরিসরে বিস্তারিতভাবে সব তুলে ধরা সম্ভব নয়। প্রমাণের জন্য তো পূর্বোল্লিখিত মারফু হাদিসসমূহই যথেষ্ট। তারপরও সংক্ষিপ্ত একটা ধারণার জন্য আমরা কতিপয় সাহাবি ও তাবিয়ির নাম উল্লেখ করছি, যারা আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর দেওয়া বৈধ বলতেন।


ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর ‘আস-সুনানুল কুবরা’-তে বলেন :

وَرُوِّينَا فِى جَوَازِ نِصْفِ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ فِى صَدَقَةِ الْفِطْرِ عَنْ أَبِى بَكْرٍ الصِّدِّيقِ وَعُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُمَا وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ وَجَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ وَأَبِى هُرَيْرَةَ وَفِى إِحْدَى الرِّوَايَتَيْنِ عَنْ عَلِىٍّ وَابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُم

‘আর আমাদের নিকট আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর দেওয়ার বৈধতার বিষয়টি আবু বকর সিদ্দিক রা., উসমান রা., আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা., জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা., আবু হুরাইরা রা. এবং এক বর্ণনানুসারে আলি রা. ও ইবনু আব্বাস রা. (সহ প্রমূখ সাহাবি) থেকে বর্ণিত হয়েছে।’ (আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৪/২৮৫, হা. নং ৭৭১৫ সংশ্লিষ্ট, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)


হাফিজ জাইলায়ি রহ. বলেন:

قُلْنَا: قَدْ وَافَقَهُ غَيْرُهُ مِنْ الصَّحَابَةِ الْجَمُّ الْغَفِيرُ بِدَلِيلِ قَوْلِهِ فِي الْحَدِيثِ: فَأَخَذَ النَّاسُ بِذَلِكَ. وَلَفْظُ "النَّاسُ" لِلْعُمُومِ فَكَانَ إجْمَاعًا. وَكَذَلِكَ مَا أَخْرَجَهُ الْبُخَارِيُّ وَمُسْلِمٌ عَنْ أَيُّوبَ السِّخْتِيَانِيُّ عَنْ نَافِعٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَدَقَةَ الْفِطْرِ عَلَى الذَّكَرِ وَالْأُنْثَى وَالْحُرِّ وَالْمَمْلُوكِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ فَعَدَلَ النَّاسُ بِهِ مُدَّيْنِ مِنْ حِنْطَةٍ وَلَا يَضُرُّ مُخَالَفَةُ أَبِي سَعِيدٍ لِذَلِكَ بِقَوْلِهِ: أَمَّا أَنَا فَلَا أَزَالُ أُخْرِجُهُ، لِأَنَّهُ لَا يَقْدَحُ فِي الْإِجْمَاعِ سِيَّمَا إذَا كَانَ فِيهِ الْخُلَفَاءُ الْأَرْبَعَةُ أَوْ نَقُولُ: أَرَادَ بِالزِّيَادَةِ عَلَى قَدْرِ الْوَاجِبِ تَطَوُّعًا

‘আমরা বলব, সাহাবিদের বিশাল একটি অংশ মুআবিয়া রা.-কে সমর্থন ও অনুসরণ করেছেন। তার প্রমাণ, হাদিসে বর্ণিত উক্তিটি- فأخذ الناس بذلك অর্থাৎ “এরপর সকল লোক (সাহাবি ও তাবিয়িগণ) তা গ্রহণ করে নিলেন।” আর الناس শব্দটি উমুম বা ব্যাপকতা বুঝায়। সুতরাং এতে (সাহাবি ও তাবিয়িদের) ইজমা সাব্যস্ত হয়। ...আর আবু সাইদ রা.-এর বক্তব্য “কিন্তু আমি সাদাকাতুল ফিতর এক সা’ পরিমাণই দিতে থাকব” বলে (উক্ত ইজমার) বিরোধিতা কোনো সমস্যার কারণ নয়। কেননা, তা (শুধু একজনের বিরোধিতা) ইজমার মধ্য কোনো ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে না; বিশেষত যখন আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর দেওয়া বৈধ হওয়ার ব্যাপারে চার খুলাফায়ে রাশিদিনের মতো শীর্ষস্থানীয় সাহাবির মত রয়েছে। অথবা (আবু সাইদ রা. এর উক্ত কথাটির ব্যাখ্যায়) আমরা বলতে পারি, (সম্ভবত) তিনি আধা সা’ এর চেয়ে বেশি তথা এক সা’ পরিমাণ নফল হিসেবে দিতে চেয়েছেন। অর্থাৎ আধা সা’ মূল ওয়াজিব সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে, আর বাকি আধা সা’ নফল সাদকা হিসেবে। (নাসবুর রায়া : ২/৪১৮ হা. নং ৩৬৪৭ ও ৩৬৪৮ সংশ্লিষ্ট, শাইখ আওয়ামা কর্তৃক তাহকিককৃত, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রাইয়ান, বৈরুত)


ইমাম ইবনু আব্দিল বার মালিকি রহ. বলেন :

وَرُوِيَ عَنْ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ وَعَلِيٍّ وَابْنِ مَسْعُودٍ وَابْنِ عَبَّاسٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ وَجَابِرٍ وَابْنِ الزُّبَيْرِ وَمُعَاوِيَةَ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ. وَفِي الْأَسَانِيدِ عَنْ بَعْضِهِمْ ضَعْفٌ وَاخْتِلَافٌ. وَكَذَلِكَ روى سعيد بن المسيب عطاء وَطَاوُسٌ وَمُجَاهِدٌ وَعُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ وَعُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ وَأَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَمُصْعَبُ بْنُ سَعْدٍ وَغَيْرُهُمْ نِصْفُ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ

‘আবু বকর রা., উমর রা., উসমান রা., আলি রা., ইবনু মাসউদ রা., ইবনু আব্বাস রা., আবু হুরাইরা রা., ইবনু জুবাইর রা. ও মুআবিয়া রা. থেকে আধা সা’ গম (দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর) দেওয়ার বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে; যদিও এর কিছু সনদে দুর্বলতা ও ইখতিলাফ আছে। সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ., আতা রহ., তাউস রহ., মুজাহিদ রহ., উমর বিন আ. আজিজ রহ., সাইদ বিন জুবাইর রহ., উরওয়া বিন জুবাইর রহ., আবু সালামা বিন আ. রহমান রহ., মুসআব বিন সাদ রহ. প্রমুখ আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে এরূপই বর্ণনা করেছেন।’ (আত-তামহিদ : ৪/১৩৭ তাহকিক : মুস্তফা বিন আহমাদ এবং আ. কাবির, প্রকাশনী : অজারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনিল ইসলামিয়্যা, মাগরিব)


ইমাম ইবনু হাজাম রহ. বলেন : 

وصح ايضًا عن طاؤس ومجاهد وسعيد بن المسيب وعروة بن الزبير وأبى سلمة بن عبد الرحمن وسعيد بن جبير وهو قول الأوزاعى والليث و سفيان الثورى.قَالَ أَبُو مُحَمَّدٍ: تَنَاقَضَ هَاهُنَا الْمَالِكِيُّونَ الْمُهَوِّلُونَ بِعَمَلِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ فَخَالَفُوا أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ وَعَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ وَعَائِشَةَ وَأَسْمَاءَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ وَأَبَا هُرَيْرَةَ وَجَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ وَابْنَ مَسْعُودٍ وَابْنَ عَبَّاسٍ وَابْنَ الزُّبَيْرِ وَأَبَا سَعِيدِ الْخُدْرِيِّ وَهُوَ عَنْهُمْ كُلِّهُمْ صَحِيحٌ إلا عَنْ أَبِي بَكْرٍ وَابْنِ مَسْعُودٍ إلا أَنَّ الْمَالِكِيِّينَ يَحْتَجُّونَ بِأَضْعَفَ مِنْ هَذِهِ الطُّرُقِ

‘আর আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বৈধতা তাউস রহ., মুজাহিদ রহ., সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ., উরওয়া বিন জুবাইর রহ., আবু সালামা বিন আ. রহমান রহ. ও সাইদ বিন জুবাইর রহ. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর এটাই আওজায়ি রহ., লাইস রহ. ও সুফইয়ান সাওরি রহ.-এর মত। ইমাম ইবনু হাজাম রহ. বলেন, মদিনাবাসীদের আমল দ্বারা প্রভাবিত মালিকিরা এক্ষেত্রে স্ববিরোধী কাজ করেছে। তারা (এ মাসআলায়) আবু বকর রা., উমর রা., উসমান রা., আলি রা., আয়িশা রা., আসমা বিনতে আবু বকর রা., আবু হুরাইরা রা., জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা., ইবনু মাসউদ রা., ইবনু আব্বাস রা., ইবনু জুবাইর রা., আবু সাইদ খুদরি রা.-এর বিরোধিতা করেছে। অথচ এটা (আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর দেওয়ার মাসআলাটি) তাঁদের সবার থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত। ব্যতিক্রম শুধু আবু বকর রা. ও ইবনু মাসউদ রা.-এর বর্ণনায়। (অর্থাৎ এ দুজনের বর্ণনায় সনদগত কিছু দুর্বলতা আছে। তথাপি তা কবুলযোগ্য যেমনটি ইমাম ইবনু হাজাম রহ.-এর সামনের উক্তি থেকে বুঝা যায়।) কিন্তু মালিকিরা (নিজেদের মতের পক্ষে) এর চেয়েও দুর্বল বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ পেশ করে।’ ( আল-মুহাল্লা : ৬/১৩০-১৩১, মাসআলা নং ৭০৪, প্রকাশনী : ইদারাতুত তাবাআতিল মুনিরিয়্যা, কায়রো)


এসব বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা মারফু তথা রাসুলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য শীর্ষস্থানীয় সাহাবা ও তাবিয়িনের আমল ও ফতোয়া দ্বারাও সুপ্রতিষ্ঠিত। সুতরাং একে হাদিসবিরোধী কিংবা ভুয়া বলা চরম অজ্ঞতা ও গোয়ার্তুমি ছাড়া কিছুই নয়। 


হাদিসে এক সা’ দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার কথা বর্ণিত হয়েছে তা আমরাও জানি। কিন্তু সাথে এটাও জানা থাকা জরুরী যে, এ এক সা’-এর বিধানটি গম ছাড়া অন্য চারটি খাদ্যের ক্ষেত্রেই কেবল প্রযোজ্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে প্রচলিত সে চারটি খাদ্য হলো- যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর। এ চারটি খাদ্যই ছিল তখনকার স্বাভাবিক খাবার। আর এক সা’-এর বিধানটি এ চারটি খাদ্যের জন্যই প্রযোজ্য।


সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে:

حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ فَضَالَةَ حَدَّثَنَا أَبُو عُمَرَ حَفْصُ بْنُ مَيْسَرَةَ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ عِيَاضِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدٍ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ وَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: وَكَانَ طَعَامَنَا الشَّعِيرُ وَالزَّبِيبُ وَالأَقِطُ وَالتَّمْرُ.

‘আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ইদুল ফিতরের দিন এক সা’ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর স্বরূপ দিতাম। আবু সাইদ রা. বলেন, আমাদের খাদ্য ছিল- যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর।’ (সহিহুল বুখারি : ২/১৩১, হা. নং ১৫১০, প্রকাশনী : দারু তাওকিন নাজাত, বৈরুত)


সহিহ বুখারির এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, এক সা’ দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি গমের সাথে সম্পৃক্ত নয়। গমের বিধান ভিন্ন হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আমরা পূর্বে একাধিক সহিহ সনদে উল্লেখ করেছি।


মূলত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে বেশিরভাগ মানুষ খেজুর, যব, পনির ও কিশমিশ―এগুলোর ওপরই জীবিকা নির্বাহ করত। তখন আরবে গমের প্রচলন কম ছিল। আর তাই সব হাদিসে গমের দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার কথা বর্ণিত হয়নি। যেগুলোতে গমের আলোচনা এসেছে তাতে গমের জন্য আধা সা’, আর অন্যান্য খাদ্যের জন্য এক সা’-এর কথাই বলা হয়েছে। সুতরাং যেসব হাদিসে গমের আলোচনাই নেই; বরং অন্যান্য খাদ্য যথা যব, কিশমিশ, পনির ও খেজুরের আলোচনা এনে এক সা’ পরিমাণ সাদাকাতুল ফিতর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেসব হাদিস দ্বারা আধা সা’ গমে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বিপরীত প্রমাণ পেশ করা বোকামি ও জ্ঞানস্বল্পতা বৈ কিছু নয়। বিবেকবান পাঠক মাত্রই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবেন।


উল্লেখ্য যে, যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য কম মূল্যের সাদাকাতুল ফিতরের ওপর ক্ষান্ত না করে অধিক দামি সাদাকাতুল ফিতরের নিসাব গ্রহণ করা উচিত। সুতরাং ধনীদের জন্য এক সা’ উন্নত মানের খেজুর বা পনির, মধ্যবিত্তদের জন্য এক সা’ মধ্যম মানের খেজুর বা কিশমিশ এবং গরিবদের জন্য এক সা’ যব বা আধা সা’ গম দ্বারা দ্বারা সাদাকাতুল আদায় করা উত্তম হবে। আমাদের দেশে সাধারণত ধনী-গরিব সবাই গণহারে আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে। অথচ এক্ষেত্রে কার্পণ্য করে সবারই গণহারে আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত নয়; বরং প্রত্যেকেরই নিজের অবস্থার দিকে তাকিয়ে সামর্থ্যের মধ্যে দামি নিসাবের খাদ্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত।


সুতরাং প্রমাণ হলো যে, আধা সা’ গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা সহিহ হাদিস ও আসারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত। এমন প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত আমলকে ভুয়া বা ভিত্তিহীন বলা অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছু নয়। এমনিতেই কারও জাহালাত বা মুর্খতাকে আমরা ততটা মারাত্মক হিসেবে বিবেচনা করি না, কিন্তু নিজের জাহালাতের ওপর পূর্ণ ভরসা করে অন্যদের দলিলসমৃদ্ধ আমলকে বাতিল বা ভুয়া বলার দুঃসাহস দেখানো অনেক বড় একটি ধৃষ্টতা, যা কেবল পথভ্রষ্ট মূর্খরাই করতে পারে। প্রথম চার প্রকারের খাদ্য দ্বারা এক সা’ করে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম হওয়া এক জিনিস, আর এটাকে আবশ্যক দাবি করে আধা সা’ গমের নিসাবকে ভুয়া বলা ভিন্ন আরেক জিনিস। বেশির চেয়ে বেশি প্রথম চার প্রকারের খাদ্য এক সা’ করে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করাকে উত্তম বলা যেতে পারে, কিন্তু আধা সা’ গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টিকে ভুয়া বলার অধিকার পৃথিবীর কারও নেই। কেননা, এটা সহিহ হাদিস ও আসারের আলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত; যেমনটি আমাদের এ প্রবন্ধে বিস্তারিত দলিল সহকারে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিকভাবে বিষয়টি বুঝার তাওফিক দান করুন।


লেখক : শায়খ তারেকুজ্জামান হাফি.

No comments:

Post a Comment

معني اللغوي الاستوي

  1.اللغوي السلفي الأديب أبو عبد الرحمن عبد الله بن يحيى بن المبارك [ت237هـ]، كان عارفا باللغة والنحو، قال في كتابه "غريب ...