১) যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে বা ভুলে সালাতের মধ্যে কথা বলে, তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। বিচ্যুতি বা ভুলবশতঃ কথা বলার ক্ষেত্রে ইমাম শাফিঈ (র.) ভিন্নমত পোষণ করেন। তার দলীল হলো সেই প্রসিদ্ধ হাদীছটি। আমাদের দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, আমাদের এ সালাত কোন মানুষের কথাবার্তার উপযোগী নয়। সালাততো তাসবীহ, তাহলীল ও কুরআন পাঠ ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইমাম শাফিঈ (র.) বর্ণিত হাদীছটি গুনাহ্ রহিত হওয়ার উপর প্রযোজ্য। ভুলে সালাম করার বিষয়টি ব্যতিক্রম। কেননা, এটা ‘যিকির’ এর মধ্যে গণ্য। সুতরাং ভুলের অবস্থায় একে যিকির ধরা হবে এবং স্বেচ্ছায় বললে কথা ধরা হবে। কেননা এতে সম্বোধনের কাপ সর্বনা্ম রয়েছে।
২) যদি সালাতের মধ্যে কাতরায় কিংবা উহ্-আহ শব্দ করে বা শব্দ করে কাদে, এগুলো যদি জান্নাত-জাহান্নামের স্মরণের কারণে হয়ে থাকে তবে সালাত নষ্ট হবে না। কেননা, এতে অধিক ‘খুশুখুযু’ প্রমাণিত হয়। আর যদি ব্যাথা বা কোন বিপদের কারণে হয়, তবে সালাত ভংগ হয়ে যাবে। কেননা তাতে অস্থিরতা ও আক্ষেপ প্রকাশ পায়। সুতরাং তা মানুষের কথার অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে। আবূ ইউসূফ (র.) থেকে বর্ণিত আছে যে, আহ্ শব্দটি উভয় অবস্থায় সালাত নষ্ট করবে না। আর ‘আওয়াহ’ শব্দটি নষ্ট করবে। কেউ কেউ বলেছেন, আবূ ইউসূফ (র.) এর মূল বক্তব্য এই যে, উচ্চারিত শব্দ যদি দুই হরফ বিশিষ্ট হয় আর উভয় হরফ কিংবা একটি যদি (আরবী ব্যকরণ মতে) অতিরিক্ত হরফ সমষ্টির অন্তর্ভূক্ত হয় তাহলে সালাত ফাসিদ হবে না। আর উভয়টি যদি মূল হরফ সমষ্টির অন্তর্ভূক্ত হয় তবে ফাসিদ হয়ে যাবে। আর অতিরিক্ত হরফ সমষ্টির অন্তর্ভূক্ত ফকীহগণ বাক্যে একত্র করেছেন। এ বক্তব্য সবল নয়। কেননা প্রচলিত অর্থে মানুষের কথা বর্ণোচ্চারণ ও অর্থ বুঝানোর অনুগামী। আর তা এমন ধ্বনির ক্ষেত্রেও সাব্যস্ত হতে পারে, যার সব ক’টি বর্ণ ‘অতিরিক্ত’ বর্ণসমষ্টির অন্তর্ভূক্ত।
৩) যদি বিনা ওযরে গলা খাকারি দেয়, অর্থাত্ অনন্যোপায় অবস্থায় হয়নি, আর তার ফলে বর্ণসমূহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মদ (র.) এর মতে সালাত ফাসিদ হওয়াই যুক্তিযুক্ত। আর যদি ওযরের কারণে হয় তবে তা মা’ফ। যেমন হাচিঁ ও ঢেকুর; যখন এতে হরফ প্রকাশিত হয়।
৪) কেউ হাচি দিলো আর অন্যজন সালাতের মধ্যেই তাকে ইয়ার হামুকাল্লাহ্ বলে ফেললো তবে তার সালাত ফাসিদ হয়ে যাবে। কেননা, এটি ব্যবহৃত হয় মানুষের পরস্পর সম্বোধনের ক্ষেত্রে। সুতরাং কাজের কথার মধ্যে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে হাচিদাতা অথবা শ্রোতা যদি আল হামদুলিল্লাহ্ বলে তবে সালাত ফাসিদ হবে বলেই ফকীহদের মত। কেননা, এটা জবাব হিসাবে প্রচলিত নয়।
৫) যদি কিরাত পাঠকারী ব্যক্তি আটকা পড়ে লোকমা চায় আর অন্য ব্যক্তি সালাতে থেকেই তাকে লোকমা দিয়ে তবে তার সালাত ফাসিদ হয়ে যাবে। এর মূল অর্থ হল মুসল্লি নিজে ইমাম ছাড়া অন্য কাউকে বলে দেয়। কেননা, এরূপ করা শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণের অন্তর্ভূক্ত। তা মানুষের কথার মধ্যে গণ্য হবে। তবে মাবসূত কিতাবে একাধিকবার করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কেননা এটা সালাতের আমলসমূহের অন্তর্ভূক্ত নয়। কাজেই অল্প মা’ফ হবে। কিন্তু ‘জামেউস সাগীর’ কিতাবে এ শর্ত আরোপ করা হয়নি। কেননা, স্বয়ং মানুষের কথা অল্প হলেও্র তা সালাত ভঙ্গকারী। আর যদি নিজের ইমামের কিরাত বলে দেয় তবে তা ‘কথা’ রূপে গণ্য হবে না, সূক্ষ কিয়াসের দৃষ্টিতে। কেননা মুক্তাদী নিজের সালাত সংশোধন করতে বাধ্য। সুতরাং এরূপ বলে দেয়া প্রকৃতপক্ষে তার সালাতের আমল হিসাবে গণ্য হবে। অবশ্য ইমামের কিরাত বলে দেওয়ারই নিয়্যত করবে। নিজে পাঠ করার নিয়্যত করবে না। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা, তাকে বলে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিরাত পাঠের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আর যদি ইমাম অন্য আয়াতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তবে লোকমাদাতার সালাত ফাসিদ হয়ে যাবে। এবং ইমামের সালাতও ফাসিদ হয়ে যাবে, যদি সে তার লোকমা গ্রহণ করে। কেননা, এখানে বিনা প্রয়োজনে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণ সংঘটিত হলো। আর মুক্তাদীর উচিত নয় বলে দেওয়ার ব্যাপারে জলদি করা। আবার ইমামেরও উচিত নয় মুক্তাদীদের বলে দেওয়ার জন্য বাধ্য করা। বরং তার কর্তব্য রুকুর সময় হয়ে গেলে রুকুতে চলে যাবেন কিংবা অন্য আয়াতের দিকে প্রত্যাবর্তন করবেন।
যদি সালাতের মধ্যে কারো উত্তরে লা ইলাহা ইলল্লালাহ বলে, তবে ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মদ (র.) এর মতে তা সালাত ফাসিদকারী কালাম বলে গণ্য হবে। কিন্তু আবূ ইউসূফ (র.) বলেন, এটা সালাত ফাসিদকারী হবে না।
এই মতভিন্নতা তখনই, যখন এই বাক্য দ্বারা উত্তর দেয়ার নিয়্যত করবে। ইমাম আবূ ইউসূফের দলীল এই যে, এ বাক্যটি আল্লাহর প্রশংসা অর্থেই গঠিত। সুতরাং তার নিয়্যতের কারণে তা পরিবর্তিত হবে না। ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মুহাম্মদ (র.) এর দলীল এই যে, বাক্যটি উত্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়েছে। আর উত্তর হওয়ার উপযোগিতা বাক্যটির মধ্যে আছে। সুতরাং একে উত্তর রূপেই গ্রহণ করা হবে। যেমন, হাচির উত্তর (ইয়ারহামুকাল্লাহ)। আর ইন্না লিল্লাহির বিষয়টিও বিশুদ্ধ মতে বিরোধপূর্ণ। যদি সে এ দ্বারা একথা জানানোর ইচ্ছা করে থাকে যে, সে সালাত রয়েছে তাহলে সর্বসম্মতিক্রমেই তার সালাত ফাসিদ হবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- তোমাদের কেউ যদি সালাতে কোন ঘটনার সম্মুখীন হয়, তবে সে যেন তাসবীহ পড়ে। যে ব্যক্তি যুহরের এক রাকাআত আদায় করল, তারপর আসর বা সাধারণ নফল শুরু করে দিলো, তাহলে তার যুহর ভংগ হয়ে গেলো। কেননা অন্য সালাত শুরু করা সহীহ হয়েছে। সুতরাং সে (বর্তমান সালাতে) যুহর থেকে বের হয়ে যাবে। যদি যুহরের এক রাকাআত আদায়ের পর আবার যুহরই শুরু করে, তাহলে সেটা যুহরই হবে এবং ঐ রাকাআতই যথেষ্ট হবে। কেননা, যে সালাতে সে বিদ্যমান আছে, হুবহু সেটাকেই শুরু করার নিয়্যত করেছে। সুতরাং তার নিয়্যত বাতিল হবে এবং নিয়্যতকৃত সালাত বহাল থাকবে। ইমাম যদি কুরআন শরীফ দেখে পাঠ করে তবে ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর মতে তার সালাত ফাসিদ হয়ে যাবে। আর ইমাম আবূ ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মদ (র.) এর মতে সালাত পূর্ণ হয়ে গেছে। কেননা এখানে এক ইবাদতের সঙ্গে অন্য ইবাদত যুক্ত হয়েছে মাত্র। তবে তা মাকরূহ হবে। কেননা এটা কিতাবীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ।
ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর দলীল এই যে, কুরআন শরীফ বহন করা দেখা এবং পাতা উল্টানো, এগুলো আমলে কাছীর (বা বেশী মাত্রার কাজ)। তাছাড়া এটা হচ্ছে কুরআন শরীফ থেকে পাঠ গ্রহণ। সুতরাং অন্য কারো কাছ থেকে পাঠ গ্রহণের মতো এটাও সালাত ফাসিদকারী হবে। দ্বিতীয় দলীলের আলোকে হাতে বহনকৃত ও কোন স্থানে রক্ষিত কুরআনের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু প্রথম দলীলের আলোকে উভয়ের মাঝে পার্থক্য হবে। যদি কোন লেখার দিকে দৃষ্টি দেয় আর বিষয়বস্তু (মুখে না পড়ে) বুঝে ফেলে, তবে বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে সর্বসম্মতিক্রমেই তার সালাত ফাসিদ হবে না। পক্ষান্তরে যদি কসম করে থাকে যে, অমুকের চিঠি পড়বে না, তাহলে ইমাম মুহাম্মদ (র.) এর মতে শুধু বুঝার দ্বারাই কসম ভংগ হয়ে যাবে। কেননা সেখানে (উচ্চারণ পড়াটা নয় বরং) বুঝাই হলো উদ্দেশ্য। আর সালাত ফাসিদ হয় আমলে কাছীর দ্বারা। আর তা এখানে পাওয়া যায়নি। আর যদি মুসল্লীর সামনে দিয়ে কোন স্ত্রীলোক অতিক্রম করে,তবে সালাত ভংগ হবে না। কেননা হুযূর (সা.) বলেছেন- কোন কিছুর অতিক্রম সালাত ভংগ করে না। তবে অতিক্রমকারী গুনাহগার হবে। কেননা রাস্রলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- যদি মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানতো যে, তার কত গুনাহ হবে, তাহলে সে চল্লিশ (দিন বা মাস বা বছর) পর্যন্ত দাড়িয়ে থাকতো। কথিত মতে যদি সে মুসল্লীর সাজদার স্থান দিয়ে অতিক্রম করে এবং উভয়ের মাঝে কোন আড়ালে না থাকে, তদ্রুপ দোকানে (বা অন্য কোন উচু স্থানে) যদি সালাত আদায় করে এবং অতিক্রমকারীর অংগসমূহ তার অংগের সোজাসুজি হয় তবে গুনাহগার হবে। আর যে ব্যক্তি মরুভুমিতে (বা খোলা স্থানে) সালাত আদায় করে তার জন্য উচিত নিজের সামনে একটি সুতরাহ্ গ্রহণ করা। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- তোমাদের কেউ যখন মরুভুমিতে সালাত আদায় করে, তখন সে যেন নিজের সামনে সুতরাহ্ গ্রহণ করে। ‘সুতরাহ্’ এর পরিমাণ হলো একগজ বা তার বেশী। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- তোমাদের কেউ যখন মরুভূমিতে সালাত আদায় করে তখন সে কি নিজের সামনে হাউদার পিছনের কাঠের মতো কিছু একটা ধারণ করতে পারে না?
বলা হয়েছে যে, তা আংগুলের মত মোটা হওয়া দরকার। কেননা এর চাইতে সরু হলে দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হবে না। ফলে উদ্দেশ্যও হাসিল হবে না। ‘সুতরাহ’ এর কাছাকাঠি দাড়াবে। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি ‘সুতরাহ’ এর সামনে সালাত আদায় করে, সে যেন ‘সুতরাহ’র নিকটবর্তী দাড়ায়। ‘সুতরাহ্’ ডান ভ্রূ বা বাম ভ্রূ বরাবর স্থাপন করবে। হাদীছে এরূপই বর্ণিত হয়েছে। যদি অতিক্রমণের আশংকা না থাকে এবং রাস্তা সামনে রেখে না দাড়ায়, তবে সুতরাহ্ বাদ দেওয়ার কোন অসুবিধা নেই। ইমামের সুতরাহ্ জামা’আতের সুতরাহ্ বলে গণ্য হবে। কেননা, রাসূলু্ল্লাহ (সা.) মক্কার ‘সমতল ভুমিতে’ লাঠি সামনে রেখে সালাত আদায় করেছে; কিন্তু জামা’আতের সামনে কোন সুতরাহ্ ছিল না। (সুতরাহ্) মাটিতে গেড়ে রাখাই গ্রহণীয়, ফেলে রাখা বা মাটিতে দাগ টানা নয়। কেননা তা দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। যদি সামনে সুতরাহ্ না থাকে অথবা তার ও ‘সুতরাহ্’র মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করতে চায়, তবে অতিক্রমকারীকে বাধা দিবে। কেননা, রাসূলুল্লা্হ্ (সা.) বলেছেন- যতটা পারো বাধা দাও। আর ইশারার মাধ্যমে বাধা দিবে। উম্মু সালামা (রা.) এর দুই ‘সন্তান’ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এমনই করেছেন। কিংবা তাসবীহ পড়ে রোধ করবে। প্রথম হলো ঐ হাদীছ, যা ইতোপূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি। (ইশারা ও তাসবীহ) উভয়টি একত্র করা মাকরূহ হবে। কেননা (উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য) একটিই যথেষ্ট।
No comments:
Post a Comment