মিহরাবঃ
বর্তমানে মেহরাব মসজিদ হিসেবেই নির্মাণ করা হয়। তাই মেহরাবের ভিতরে দাঁড়িয়ে নামায পড়ালেও নামায শুদ্ধ হবে।
তবে উত্তম হল, মেহরাবের কিছুটা বাহিরে দাঁড়ানো। সেজদা মেহরাবের ভিতরে করা।
كان المحراب من السمجد كما هو العادة المستمرة (البحر الرائق-2/414)
أى لأن المحراب أنما بنى علامة لمحل قيام الإمام ليكون قيامة وسط الصف كما هو السنة… فهو وإن كان من بقاع المسجد… الخ (رد المحتار، كتاب الصلاة، باب ما يفسد الصلاة وما يكره فيها-2/)
“و” يكره “قيام الإمام” بجملته “في المحراب” لا قيامه خارجه وسجوده فيه – سمي محرابا لأنه يحارب النفس والشيطان بالقيام إليه – والكراهة لاشتباه الحال على القوم وإذا ضاق المكان فلا كراهة (حاشية الطحطاوى على مراقى الفلاح-360-361)
إذَا كَانَ الْمِحْرَابُ مَكْشُوفًا بِحَيْثُ لَا يَشْتَبِهُ حَالُ الْإِمَامِ عَلَى مَنْ هُوَ فِي الْجَوَانِبِ لَا يُكْرَهُ لِلضَّرُورَةِ (تبيين الحقائق، كتاب الصلاة، باب ما يفسد الصلاة وما يكره فيها-1/165)
وَيُكْرَهُ قِيَامُ الْإِمَامِ وَحْدَهُ فِي الطَّاقِ وَهُوَ الْمِحْرَابُ وَلَا يُكْرَهُ سُجُودُهُ فِيهِ إذَا كَانَ قَائِمًا خَارِجَ الْمِحْرَابِ هَكَذَا فِي التَّبْيِينِ وَإِذَا ضَاقَ الْمَسْجِدُ بِمَنْ خَلْفَ الْإِمَامِ فَلَا بَأْسَ بِأَنْ يَقُومَ فِي الطَّاقِ. (الفتاوى الهندية-1/108
মিম্বর তিন স্তর বিশিষ্ট হওয়ার বিশেষ কোন তাৎপর্য পাওয়া যায় না। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তিন স্তর বিশিষ্ট মিম্বর ব্যবহার করেছেন (ইবনু মাজাহ হা/১৪১৪; আওনুল মাবুদ হা/১০৭৬ -এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)। মু‘আবিয়া (আঃ)-এর খেলাফত কালে মদীনার গবর্নর মারওয়ান আরও তিন স্তর বৃদ্ধি করে মোট ছয় স্তরে উন্নীত করেছিলেন (ফাৎহুল বারী ২/৪৬৩; আওনুল মাবুদ, পৃঃ ২৯৭)।
রাসূল (ছাঃ)-এর মেম্বার তিন স্তর বিশিষ্ট ছিল (মুসলিম হা/৫৪৪; ইবনু মাজাহ হা/১৪১৪; আহমাদ হা/২৪১৯)। মু‘আবিয়া (রাঃ) মিম্বারের স্তর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন যাতে লোকেরা তাঁকে দেখতে পায় এবং তাঁর কথা শুনতে পায়’ (ফাৎহুল বারী ২/৩৯৯; ঊমদাতুল কারী ৬/২১৬; হাশিয়াতুস সুয়ূতী আলা সুনানিন নাসাঈ ২/৫৯; (সামহুদী, খোলাছাতুল ওয়াফা বিআখবারি দারিল মুছতাফা ২/৫১-৫৪)।
বসার স্থানসহ তিন সিঁড়িবিশিষ্ট মিম্বার বানানো উত্তম। কারণ রাসূল সা. এর জন্য যে মিম্বার বানানো হয়েছিল তা বসার স্থানসহ তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট ছিল যা বিভিন্ন হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।
বায়হাকী শরীফ ২/৫৫৮, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৮/১৯৯
মসজিদের মিম্বর তিন ধাপ বিশিষ্ট হবে এবং প্রত্যেকটি ধাপ এতটুকু উঁচু করবে যাতে খতীব সাহেব সেখানে আরামের সাথে বসতে পারেন। তিনের অধিক ধাপ বিশিষ্ট মিম্বর বানানোর কোন প্রমাণ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নেই। হ্যাঁ তৃতীয় ধাপের উপর হেলান দেয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। (ফাতহুল বারী-২/৪৯০, বাযলুল মাজহূদ-২/১৭৮, ইমদাদুল আহকাম-৩.১৯৫, মাহমূদিয়া-১০/১৯১)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিম্বারটি ছোট আকারের ছিল এবং তা তিন তাক বিশিষ্ট ছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৪১৯)
যে স্থানে দাঁড়িয়ে রাসুল (সা.) সাহাবাদের সামনে খোতবা দিতেন, এটাকে মসজিদে নববীর সবচেয়ে প্রধান ও পবিত্র জায়গাগুলোর মধ্যে শুমার করা হয়। মুবারকপুরী বলেন, মসজিদে নববী (সা.)-এর সর্বপ্রথম মিম্বরটি তৈরি করা হয় খেজুরের তক্তা দিয়ে- এতে তিনটি ধাপ বা স্তর ছিল। রাসুলের ওফাতের পরে পরবর্তী খলিফাগণও এই মিম্বরে দাঁড়িয়ে খোতবা দিতেন। হজরত আবু বকর ও ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তাঁরা দুজনেই মিম্বরের দ্বিতীয় সিঁড়িতে আরোহন করে খোতবা প্রদান করতেন। হজরত ওসমান শুরুতে প্রথম সিঁড়িতে পরবর্তী সময়ে রাসুলের মতোই তৃতীয় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে খোতবা দিয়েছেন।
কিন্তু ৮৮৬ হিজরিতে আগুন লাগার ঘটনায় মহানবীর মিম্বরটি পুড়ে যায়। এরপর মদিনাবাসী ইট দিয়ে একটি মিম্বর তৈরি করেন। মামলুক শাসনামলে সুলতান কায়েতবাই মরমর পাথরের একটি সুদৃশ্য মিম্বর প্রেরণ করেন।
মদিনার ঈদগাহে উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকামই সর্বপ্রথম মিম্বার স্থাপন করেন। লোকেরা তার এই কাজের প্রতিবাদ করেছে। আর কাছীর ইবনুস সালতই সর্বপ্রথম মারওয়ানের শাসনামলে পাকা মিম্বার তৈরী করেন।
মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি খেজুর গাছের শুকনা কাঠের সঙ্গে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। দিনে দিনে মসজিদে নববীতে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে পেছনের সাহাবিদের জন্য খুতবা শুনা কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে মদিনার এক আনসারি সাহাবি একটি মিম্বর তৈরি করলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সেই নতুন মিম্বরে উঠে খুতবা দেয়া শুরু করলেন, তখন উপস্থিত সাহাবাগণ ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বর থেকে নেমে সেই খেজুর গাছের নিকটে গিয়ে খেজুর গাছটিকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এই ভাবে কান্না করছ কেন?
উত্তরে সেই খেজুর গাছটি বলতে শুরু করল, হুজুর আপনি আমার ওপর হেলান দিয়ে আর কোনোদিন খুতবা দিবেন না তা আমি সহ্য করতে পারছিনা। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বুকে জড়িয়ে সান্তনা দিলেন এবং জান্নাতে নবীজির (সা.) সঙ্গে থাকার সুসংবাদ দিলেন এবং উপস্থিত সাহাবাদেরকে নির্দেশ দিলেন তাকে যেন নতুন মিম্বরের নিচে দাফন করা হয়।
(ফাতহুল বোখারি হাদিস নম্বর ৩৯৯, ইবনে মাজাহ হাদিস নম্বর-১৪১৫)
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) খেজুর গাছের গুড়ির সঙ্গে ভর দিয়ে জুমার খুতবা দিতেন। যখন মিম্বর তৈরি করা হল খেজুরের গুড়িটা কাঁদতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা.) গাছটির নিকট গেলেন এবং তা স্পর্শ করলেন। ফলে এটা চুপ করল।
জামে তিরমিযী ৫০৫, সুনানে দারেমী ৩১, সুনানুল কুবরা ৫৫৬৭, বুখারি ৩৩৯০
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মিম্বর বানানোর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি কাঠখণ্ডের নিকট দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বর বানালেন এবং সেটির দিকে ফিরে গেলেন, তখন কাঠখণ্ডটি কান্নাজুড়ে দিল। ফলে নবীজি (সা.) এটিকে আলিঙ্গন করলেন, অতঃপর এটি শান্ত হল। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন আমি যদি একে আলিঙ্গন না করতাম, তবে অবশ্যই তা কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে কাঁদতে থাকত।
সুনানে দারেমী ৩৯, মুসনাদে আহমাদ ১/২৪৯, ২৬৩, ২৬৭ ইবনু আবী শাইবা ১১/৪৮৪
কাণ্ডটি এজন্য কাঁদছিল যেহেতু সে খুতবাকালে জিকির শুনতে পেত।
বুখারি ৩৩৯১,সহীহ ইবনে খুযাইমাহ: ১৭৭৭
মাওলানা রুমি মসনবি শরিফে এর দৃশ্যপটটি এঁকেছেন বড় সুন্দরভাবে।
ক্রন্দসী খুঁটি বিরহ বিচ্ছেদে রাসুলকে হারিয়ে
মানুষের মতো করে আর্তনাদ বুক ভাসিয়ে।
পয়গাম্বর বললেন, তুমি কী চাও বল আমাকে,
বলে, বুকটা রক্তে রঞ্জিত আপনার বিচ্ছেদে।
নবীজি খুঁটিকে জিজ্ঞেস করলেন, কী চাও তুমি, কাঁদছ কেন? খুঁটি জবাব দেয়, আপনি আমাকে ছেড়ে গেছেন, তাই আমার বুকে এখন রক্ত ঝরে।
ছিলাম আপনার মসনদ আমি, ছেড়ে গেছেন ফেলে
মিম্বরের ওপরে আসন নিয়েছেন তাই হৃদয় জ্বলে।
বললেন, তুমি কি চাও যে এমন খেজুর বৃক্ষ হবে,
পূর্ব পশ্চিমের মানুষ আগ্রহে তোমার ফল খাবে?
নবীজি বললেন, তুমি যে আমার বিরহে কাঁদছ, কি পেলে তুমি শান্ত হবে? তুমি কি চাও যে, তুমি এমন খেজুর গাছ হবে, যার ফল সারা দুনিয়ার মানুষ আগ্রহ ও ভক্তি নিয়ে খাবে, সবাই পরিতৃপ্ত হবে? নাকি ওই জগতে আল্লাহ বানাবে তোমায় দেবদারু এমন চিরদিন তুমি তরতাজা রবে, যেখানে জান্নাত কানন।
বলল : তাই চাই। হয় স্থায়ী যাতে মোর এ জীবন,
শুনো হে গাফেল কাঠের চেয়ে হয়ো না তুচ্ছ মন।
খুঁটি বলল, হ্যাঁ আমি চাই চিরন্তন জীবন।
মাওলানা বলছেন, ওহে গাফিল মানুষ! তুমি অন্তত খুঁটির চেয়ে তুচ্ছ হইও না। অনন্ত জীবনকে অবজ্ঞা করে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন নিয়ে মত্ত হয়ে থেকো না।
প্রশ্নোত্তর শেষ হলো দাফন করলেন সেই খুঁটি তিনি মাটিতে পুঁতে মানুষের ন্যায় হাশরে উঠবে যেন আখেরাতে।
(মসনবি শরিফ, প্রথম খ, বয়েত : ২১১৩-২১২১)।
No comments:
Post a Comment