(মানুষ মারা গেলে তার প্রতি করণীয়, মৃতকে গোসলদেয়া, কাফন দেয়া, জানাযার সালাত আদায় ওদাফনের পদ্ধতি)
ক) ভূমিকা: মৃত্যু অবধারিত সত্য। মৃত্যু থেকে পালাবারকোন পথ নেই। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذاَئِقَةُ الْمَوْتِ
“প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।” (আলইমরান- ১৮৫) তিনি আরো বলেন: “মৃত্যু যন্ত্রনাসত্যসত্যই আগমণ করবে, যা থেকে তুমি অব্যাহতিচাচ্ছিলে।” (ক্বাফ- ১৯)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলনে: “কখনই নয়, যখন প্রাণকন্ঠাগত হবে এবং বলা হবে কে তাকে (রক্ষা করারজন্য) ঝাড়-ফুঁক করবে। আর সে মনে করবে যে,বিদায়ের সময় এসে গেছে।” (ক্বিয়ামাহ্- ২৬-২৮)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
أكْثِرُواْ مِنْ ذِكْرِ هاَدِمِ اللَّذَّاتِ
“জীবনের স্বাদ বিনষ্টকারী (মৃত্যুর) কথা তোমরা বেশীবেশী স্মরণ কর।” (তিরমিযী, নাসাঈ, ইরউয়া- ৬৮২)তাই প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হল অধিকহারেসৎআমল করা এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
খ) কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে উপস্থিতজীবিতদের উপর নিম্ন লিখিত কাজগুলো আবশ্যকহয়ে যায়:
১) মৃতের চোখ দুটি বন্ধ করে দিবে। যখন আবূ সালমা(রা:) মৃত্যু বরণ করেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম তাঁর চোখ দুটি বন্ধ করে দিয়ে বলেন:
إنَّ الرُّوحَ إذاَ قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ
“যখন জান কবজ করা হয়, তখন দৃষ্টি তার অনুসরণকরে।” (মুসলিম) ২) তার জোড় সমূহ নরম করে দিবে,যাতে করে তা শক্ত না হয়ে যায়। আর পেটের উপরভারী কিছু রেখে দিবে যাতে করে তা ফুলে না যায়।
৩) বড় একটি কাপড় দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে দিবে।আয়েশা (রা:) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর তাঁকে নকশা খচিতএকটি কাপড় দিয়ে ঢেঁকে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
৪) ছহীহ্ হাদীছের নির্দেশ মোতাবেক মৃত ব্যক্তিকেগোসল, জানাযা ছালাত এবং দাফনের ক্ষেত্রে দ্রুততাঅবলম্বন করবে। (বুখারী ও মুসলিম)
৫) যে এলাকায় তার মৃত্যু হবে সেখানেই তাকে দাফনকরা। কেননা ওহুদ যুদ্ধের শহীদদেরকে নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই দাফন করেছিলেন।(সুনান গ্রন্থ)
গ) মৃতকে গোসল দেয়ার পদ্ধতি:
১. মৃতের গোসল, কাফন, জানাযার ছালাত এবং দাফনকরা ফরযে কেফায়া।
২. গোসল দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সেই ব্যক্তি হকদার,যার ব্যাপারে মৃত ব্যক্তি ওছিয়ত করে গিয়েছে। তারপরতার পিতা। তারপর অপরাপর নিকটাত্মীয়। আরমহিলার গোসলে প্রথম হকদার হল তার ওছিয়তকৃতমহিলা। তারপর তার মা। তারপর তার মেয়ে। তারপরঅন্যান্য নিকটাত্মীয় মহিলাগণ।
৩. স্বামী-স্ত্রী পরষ্পরকে গোসল দিতে পারবে। রাসূলুল্লাহ্সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রা:)কেবলেন: “তোমার কোন অসুবিধা নেই, তুমি যদি আমারআগে মৃত্যু বরণ কর, তবে আমি তোমার গোসল দিব।” (আহমাদ হাদীছ ছহীহ্) আর আবু বকর (রা:) ওছিয়তকরেছিলেন যে, তার স্ত্রী যেন তাঁকে গোসল দেয়।(মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক- হা/৬১৬৭)
৪. মৃত ব্যক্তি নারী হোক বা পুরুষ তার বয়স যদি সাতবছরের কম হয়, তবে যে কোন পুরুষ বা মহিলা তারগোসল দিতে পারবে।
৫. গোসলের জন্য পুরুষের ক্ষেত্রে পুরুষ আর নারীরক্ষেত্রে নারী যদি না পাওয়া যায় তবে তার গোসল দিবেনা। বরং তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে। এর পদ্ধতি হল,উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন তার হাত দুটি পাকমাটিতে মারবে। তারপর তা দ্বারা মৃতের মুখমন্ডল ওউভয় হাত কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করে দিবে।
৬. কোন কাফেরকে গোসল দেয়া এবং দাফন করামুসলমানের উপর হারাম। আল্লাহ্ বলেন:
ولاَ تُصَلِّ عَلىَ أحَدٍ مِنْهُمْ ماَتَ أبَداً
৭. “আপনি তাদের (কাফের ও মুনাফেকদের) কখনইজানাযা ছালাত আদায় করবেন না।” (তওবাহ্- ৪৮)
৮. গোসল দেয়ার সুন্নাত হল, প্রথমে তার লজ্জাস্থানঢেঁকে দেবে, তারপর তার সমস্ত কাপড় খুলে নিবে।(যেমন দেখুন নিচের ছবিটি)
অত:পর তার মাথাটা বসার মত করে উপরের দিকেউঠাবে এবং আস্তে করে পেটে চাপ দিবে, যাতে করেপেটের ময়লা বেরিয়ে যায়। (যেমন দেখুন ছবিটি)
এরপর বেশী করে পানি ঢেলে তা পরিস্কার করে নিবে।তারপর হাতে কাপড় জড়িয়ে বা হাত মুজা পরে তা দিয়েউভয় লজ্জা স্থানকে (নযর না দিয়ে) ধৌত করবে।
তারপর ‘বিসমিল্লাহ্’ বলবে এবং ছালাতের ন্যায় ওযুকরাবে। তবে মুখে ও নাকে পানি প্রবেশ করাবে না। বরংভিজা কাপড় আঙ্গুলে জড়িয়ে তা দিয়ে তার উভয়ঠোঁটের ভিতর অংশ ও দাঁত পরিস্কার করবে। একই ভাবে নাকের ভিতরও পরিস্কার করবে।
৯. পানিতে কুল পাতা মিশিয়ে তা ফুটিয়ে বরই পাতা দিয়েফোটানো পানি দ্বারা মৃতের মাথা ও দাঁড়ি ধৌত করতেহবে।
প্রথমে শরীরের ডান পাশের সামনের দিক ধৌত করবে। (যেমন দেখুন নিচের ছবিটি)
তারপর পিছন দিক তারপর বাম দিক ধৌত করবে।(দেখুন নিচের ছবিটি)
এভাবে তিনবার গোসল দিবে। প্রতিবার হালকা ভাবেপেটে হাত বুলাবে এবং ময়লা কিছু বের হলে পরিস্কারকরে নিবে।
১০. গোসলের সময় সাবান ব্যবহার করতে পারে এবংপ্রয়োজন মোতাবেক তিনবারের বেশী সাত বা ততোধিকগোসল দিতে পারে। শেষবার কর্পুর মিশ্রিত করে গোসলদেয়া সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা যায়নাবের (রা:) শেষ গোসলে কর্পুরমিশ্রিত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
১১. মৃতের মোচ বা নখ যদি বেশী বড় থাকে তবে তাকেটে দেয়া মুস্তাহাব। তবে বগল বা নাভীর নীচের চুলকাটা যাবে না।
১২. সাত বার গোসল দেয়ার পরও যদি পেট থেকেময়লা (পেশাব বা পায়খানা) বের হতেই থাকে তবে উক্তস্থান ধুয়ে সেখানে তুলা বা কাপড় জড়িয়ে দিবে। তারপরতাকে ওযু করাবে।
১৩. কাফন পরানোর পরও যদি ময়লা বের হয়, তবেআর গোসল না দিয়ে সেভাবেই রেখে দিবে। কেননা তাঅসুবিধার ব্যাপার।
১৪. মৃতের চুল আঁচড়ানোর দরকার নেই। তবে নারীরক্ষেত্রে তার চুলগুলোতে তিনটি বেণী বেঁধে তা পিছনেছড়িয়ে দিবে।
১৫. হজ্জ বা ওমরায় গিয়ে ইহরাম অবস্থায় যদি কেউমারা যায়, তবে তাকে কুল পাতা মিশ্রিত পানি দিয়েগোসল দিবে। কিন্তু কোন সুগন্ধি ব্যবহার করবে না এবংপুরুষ হলে কাফনের সময় তার মাথা ঢাঁকবে না। বিদায়হজ্জে জনৈক ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলেনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তাকেকোন সুগন্ধি লাগাবে না, এবং তার মাথা ঢাঁকবে না।কেননা সে ক্বিয়ামত দিবসে তালবিয়া পাঠ করতে করতেউত্থিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
১৬. ব্যক্তিকে গোসল দিবে না, এবং তাকে তার সাথেসংশ্লিষ্ট কাপড়েই দাফন করবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম “ওহুদের শহীদদের ব্যাপারেআদেশ দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে গোসল ছাড়া তাদেরপরিহিত কাপড়ে দাফন করা হবে।” (বুখারী) “এমনিভাবে তাদের ছালাতে জানাযাও পড়েন নি।” (বুখারী ও মুসলিম)
১৭. গর্ভস্থ সন্তান যদি চার মাস অতিক্রম হওয়ার পরপড়ে যায়, তবে তার গোসল ও জানাযার ছালাত আদায়করবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেন: “মাতৃগর্ভে সন্তানের বয়স যখন চার মাসঅতিক্রম করে তখন সেখানে একজন ফেরেস্তা প্রেরণকরা হয়। সে তাতে রূহ ফুঁকে দেয়।” (মুসলিম) আর তারবয়স যদি চার মাসের কম হয়, তবে তাতে প্রাণ নাথাকার কারণে সাধারণ একটি মাংশের টুকরা গণ্য হবে।যা কোন গোসল বা জানাযা ছাড়াই যে কোন স্থানেমাটিতে গেড়ে দেয়া হবে।
১৮. মৃত ব্যক্তি আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারণে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার কারণে বা পানি না পাওয়ারকারণে যদি তাকে গোসল দেয়া সম্ভব না হয়, তবে পূর্বনিয়মে তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে।
ঘ) কাফন দেয়ার পদ্ধতি:
১. মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানো ওয়াজিব। আর তা হবেতার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে। যাবতীয় ঋণ, ওছিয়তএবং মীরাছ বন্টনের আগে কাফনের খরচ তার সম্পত্তিথেকে গ্রহণ করতে হবে।
২. মৃতের সম্পত্তি থেকে যদি কাফনের খরচ না হয় তবেতার পিতা বা ছেলে বা দাদার উপর দায়িত্ব বর্তাবে। যদিএমন কাউকে না পাওয়া যায় তবে বায়তুল মাল থেকেপ্রদান করবে। তাও যদি না পাওয়া যায় তবে যে কোনমুসলমান প্রদান করতে পারে।
৩. পুরুষকে তিনটি লেফাফা বা কাপড়ে কাফন পরানোমুস্তাহাব। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুতী সাদা তিনটি কাপড়েই কাফন দেয়া হয়েছি।(বুখারী ও মুসলিম) কাফনের কাপড়ে সুগন্ধি মিশ্রিতকরা মুস্তাহাব। প্রথমে সাতটি ফিতা বিছিয়ে দিবে।তারপর (ফিতাগুলোর উপর) কাপড় তিনটি একটিরউপর অন্যটি বিছাবে।
অত:পর মাইয়্যেতকে চিৎ করে শুইয়ে দিবে। এসময়তার লজ্জাস্থানের উপর একটি অতিরিক্ত কাপড় রেখেদিবে। (যেমন দেখুন নিচের ছবিটি)
তার নাক, কান, লজ্জাস্থান প্রভৃতি জায়গায় সুগন্ধি যুক্ততুলা লাগিয়ে দেয়া মুস্তাহাব। সম্ভব হলে সমস্ত শরীরেসুগন্ধি লাগাবে। তারপর প্রথম কাপড়টির ডান দিকআগে উঠাবে, এরপর বাম দিকের কাপড়। এভাবেদ্বিতীয় ও তৃতীয় কাপড়ে করবে। (যেমন দেখুন নিচেরছবিটি)
তারপর অতিরিক্ত কাপড়টি টেনে নিবে এবংফিতাগুলো দিয়ে গিরা দিবে। আর তা কবরে রাখার পরখুলে দিবে। ফিতার সংখ্যা সাতের কম হলেও অসুবিধানেই। (যেমন দেখুন নিচের ছবিটি)
মৃত ব্যক্তিকে ৭টি বাঁধন দিবে
৪. মহিলাকে পাঁচটি কাপড়ে কাফন দিবে। লুংগি যানীচের দিকে থাকবে, খেমার বা ওড়না যা দিয়ে মাথাঢাঁকবে, কামীছ (জামা) এবং দুটি বড় লেফাফা বাকাপড়। (অবশ্য তিন কাপড়েও তাকে কাফন দেয়াজায়েয)।
ঙ) জানাযার ছালাত আদায় করার পদ্ধতি:
১. জানাযার ছালাত আদায় করা ফরযে কেফায়া।
২. জানাযা পড়ার সময় সুন্নাত হল, ইমাম পুরুষের মাথা বরাবর দাঁড়াবে। (যেমন দেখুন নিচের ছবিটি)
আর মহিলার মধ্যবর্তী স্থান বরাবর দাঁড়াবে। (যেমনদেখুন নিচের ছবিটি)
৩. চার তাকবীরের সাথে জানাযা আদায় করতে হয়।অন্তরে নিয়্যত করে দাঁড়াবে। (আরবীতে বা বাংলায় মুখেনিয়ত বলা বা শিখিয়ে দেয়া বিদআত।)
৪. প্রথম তাকবীর দিয়ে আঊযুবিল্লাহ্… বিসমিল্লাহ্…পাঠ করে সূরা ফাতিহা তারপর ছোট কোন সূরা পাঠকরবে। (ছানা পাঠ করার কোন ছহীহ্ হাদীছ নেই)দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দরূদে ইবরাহীম (যা ছালাতে পাঠকরতে হয়) পাঠ করবে।এরপর তৃতীয় তাকবীর দিয়ে জানাযার জন্য বর্ণিত যে কোন দুআ পাঠ করবে। এইদু’আটি পাঠ করা যেতে পারে:
اللهمَّ اغْفِرْ لِحَيِّناَ وَمَيِّتِنَا وَشاَهِدِناَ وَغَائِبِناَ ، وَصَغِيْرَناَ وَكَبِيْرِناَ، وَذَكَرِناَ وَأُنْثاَناَ، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِناَّ فَأَحْيِهِ عَلَى الإسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِناَّ فَتَوَفَّهُ عَلىَ الإيْمَانِ، اللَّهُمَّ لاَتَحْرِمْناَ أجْرَهُ وَلاَتُضِلَّناَ بَعْدَهُ
“হে আল্লাহ্! আপনি আমাদের জীবিত-মৃত, উপস্থিত,অনুপস্থিত, ছোট ও বড় নর ও নারীদেরকে ক্ষমা করুন।হে আল্লাহ্! আমাদের মাঝে যাদের আপনি জীবিতরেখেছেন তাদেরকে ইসলামের উপরে জীবিত রাখুন,এবং যাদেরকে মৃত্যু দান করেন তাদেরকে ঈমানেরসাথে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ্! আমাদেরকে তারছওয়াব হতে বঞ্চিত করবেন না এবং তার মৃত্যুর পরআমাদেরকে পথ ভ্রষ্ট করবেন না।” (ইবনে মাজাহ্, আবূদাঊদ)
এবং এই দু’আটিও পড়তে পারে:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعاَفِهِ واَعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْماَءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرْدِ، وَنَقِّهِ مِنْ الْخَطاَياَ كَمَا يُنَقَّىالثَّوْبُ الأبْيَضُ مِنْ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِّنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِّنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذاَبِ الْقَبْرِ، وَعَذاَبِ النَّارِ
“হে আল্লাহ্! আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়াকরুন, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখুন। তাকে মাফ করেদিনতার আতিথেয়তা সম্মান জনক করুন তার বাস স্থানকে প্রশস্থ করে দিন আপনি তাকে ধৌত করুন পানি, বরফ ও শিশির দিয়ে। তাকে গুনাহ হতে এমনভাবে পরিস্কার করুন যেমন করে সাদা কাপড়কে ময়লা হতে পরিস্কার করা হয়। তাকে তার (দুনিয়ার) ঘরের পরিবর্তে উত্তম ঘর দান করুন। তার (দুনিয়ার) পরিবারঅপেক্ষা উত্তম পরিবার দান করুন। আরো তাকে দানকরুন (দুনিয়ার) স্ত্রী অপেক্ষা উত্তম স্ত্রী। তাকে বেহেস্তেপ্রবেশ করিয়ে দিন, আর কবরের আযাব ও জাহান্নামেরআযাব হতে পরিত্রাণ দিন। (ছহীহ্ মুসলিম ২/৬৬৩)
৬. মৃত যদি চার মাস বা তার উর্ধের শিশু হয়, তাদেরজন্য ১ম দু’আটি পাঠ করা যেতে পারে।
৭. এরপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে সামান্য একটু চুপ থেকেডান দিকে সালাম ফিরাবে। বাম দিকেও সালাম ফেরাতেপারে।
৮. কারো যদি জানাযার কিছু অংশ ছুটে যায়, তবে সেইমামের অনুসরণ করবে। আর ইমামের সালাম ফেরানোর পর লাশ উঠানোর আগে যদি সম্ভব হয় তবে বাকী তাকবীর কাযা আদায় করে নিবে। সম্ভব না হলেইমামের সাথেই সালাম ফিরিয়ে দিবে।
৯. ‘কারো যদি জানাযা ছুটে যায় তবে তার এবংকিবলার মাঝে কবরকে রেখে পূর্ব নিয়মে কবরের উপরজানাযা আদায় করতে পারে।’ (বুখারী ও মুসলিম)
জানাযার নামায ছুটে যাওয়ায় কবরে গিয়ে জানাযা পড়া হচ্ছে
১০. গায়েবী জানাযা সেই ব্যক্তির জন্য পড়া যাবে যেঅন্য কোন দেশে মৃত্যু বরণ করেছে এবং তার জানাযা আদায় করা হয়নি।
১১. ‘মসজিদের মধ্যেও জানাযার ছালাত আদায় করাজায়েয।’ (মুসলিম)
১২. জানাযার জন্য গোরস্থানের নিকটবর্তী কোনস্থানকে নির্ধারণ করা মুস্তাহাব।
১৩. আত্মহত্যাকারী, ডাকাত ইত্যাদির উপরও জানাযার ছালাত আদায় করবে। তবে দেশের আমীর এবং আলেম ব্যক্তি মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য এবং শিক্ষা দেয়ার জন্য তা থেকে বিরত থাকবে।
চ) দাফনের পদ্ধতি:
১. মৃতের খাটিয়া কাঁধে রেখে বহণ করা মুস্তাহাব।হাদীছের নির্দেশ মোতাবেক ‘লাশ দ্রুত বহণ করাসুন্নাত’। সে সময় মানুষ লাশের সামনে, পিছনে, ডাইনে,বামে যে কোন দিক দিয়ে চলতে পারবে। (আহকামুলজানায়েয- আলবানী- পৃ:৭৩)
লাশগোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
২. যে ব্যক্তি লাশের সাথে চলবে তার জন্য খাটিয়ামাটিতে রাখার আগে বসা মাকরূহ।
৩. তিনটি সময়ে ছালাত আদায় করতে এবং মুরদা দাফন করতে হাদীছে নিষেধ করা হয়েছে। ১- সূর্যউদয়ের সময়, যে পর্যন্ত তা কিছু উপরে না উঠে যায়। ২-সূর্য মাথার উপর থাকার সময়, যে পর্যন্ত তাপশ্চিমাকাশে ঢলে না যায়। ৩- সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়,যে পর্যন্ত তা পুরাপুরি ডুবে না যায়। (মুসলিম)
৪. রাতে বা দিনে যে কোন সময় লাশ দাফন করা যায়।মহিলার লাশ কবরে প্রবেশ করানোর সময় আলাদা কাপড় দিয়ে ঢেঁকে দিবে।
৫. সুন্নাত হল কবরের পায়ের দিক থেকে লাশকে কবরেনামানো।
পায়ের দিকে দিয়ে লাশ কররে রাখা হচ্ছে।
সম্ভব না হলে, ক্বিবলার দিক থেকে কবরে নামবে।
কিবলার দিক থেকে লাশ কবরে রাখা হচ্ছে।
৬. লাহাদ তথা বুগলী কবর হল উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “লাহাদ (বুগলী কবর) হলআমাদের জন্য আর শাক্ব বা বাক্স কবর হল অন্যদেরজন্য।”(আবূ দাঊদ)
লাহাদ বা বুগলীকবর, শাক্ব বা বক্সকবর
৭. হিংস্র প্রাণী এবং লাশের দুর্গন্ধ বের হওয়া থেকে হেফাযত করার জন্য কবরকে বেশী গভীর করে খননকরা সুন্নাত।
৮. যারা লাশ কবরে নামাবে তাদের জন্য সুন্নাত হল, এইদু’আ পড়া: (بِسْمِ اللهِ وَعَلىَ سُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ) উচ্চারণ:বিসমিল্লাহি ওয়া ‘আলা সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ। অর্থ:আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের সুন্নাত এর উপর।
অথবা এটা পড়বে: (بِسْمِ اللهِ وَعَلىَ مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ)উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া ‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহঅর্থ: “আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের তাঁর মিল্লাতের উপর।” (আবূ দাঊদ)
৯. লাশকে কবরের মধ্যে কিবলা মুখী করে ডান কাতেরউপর করে রাখা সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “জীবিত এবং মৃত সব অবস্থায় তোমাদের কিবলা হল কা’বা।” (বাইহাকী আহকামুলজানায়েয, আলবানী- ১৫২)
১০. লাশের মাথার নীচে কোন বালিশ বা ইট-পাথররাখবে না এবং তার চেহারার কাপড়ও খুলবে না।
১১. তারপর কবরের মুখ ইট এবং মাটি দিয়ে বা বাঁশ/চাটাই ও মাটি দিয়ে পূর্ণ করে দিবে।
১২. উপস্থিত মুসলমানদের জন্য সুন্নাত হল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণে প্রত্যেকে উক্ত কবরে তিন খাবল করে মাটি দিবে। (ইবনু মাজাহ্আহকামুল জানায়েয আলবানী- ১৫৫)
১৩. সুন্নাত হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরকবরের মত- কবরকে উটের চুঁড়ার মত মাত্র অর্ধ হাত পরিমাণ উঁচা করা। (বুখারী)
১৪. এরপর কবরের উপর কিছু পাথর কুচি ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর পানি ছিটিয়ে দিবে। (আবূ দাঊদ, ইরউয়াউলগালীল ৩/২০৬) শেষে কবরের মাথার দিকে একটি পাথর রেখে দিবে যাতে করে তা চেনা যায় এবং তার অবমাননা না হয়। যেমনটি করেছিলেন রাসূলুল্লাহ্সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঊছমান বিন মাযঊন(রা:) এর কবরে। (ছহীহ্ আবূ দাঊদ)
১৫. কবরকে পাকা করা, তার উপর ঘর উঠানো, তারনাম পরিচয় লিখা, তার উপর বসা, চলা, হেলান দিয়েবসা সবই ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী হারাম কাজ। (মুসলিম,আবূ দাঊদ প্রভৃতি)
১৬. অধিক প্রয়োজন ছাড়া এক কবরে একের অধিক ব্যক্তিকে দাফন করা মাকরূহ।
১৭. মৃতের পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী করে তাদেরকাছে প্রেরণ করা মুস্তাহাব। হযরত জাফর বিন আবী তালেবের শাহাদাতের সংবাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেছিলেন: “তোমরা জাফর পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী কর, কেননা তারা বিপদগ্রস্থ হয়েছে।” (ছহীহ্ আবূ দাঊদ)
১৮. মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য খানাপ্রস্তুত করা জায়েয নয়। ‘ছাহাবায়ে কেরাম (রা:)মানুষের জন্য খানা প্রস্তুত করা এবং শোক বাণী জানানোর জন্য মৃতের বাড়ীতে একত্রিত হওয়াকে নিষিদ্ধ নিয়াহা বা মৃতের জন্য বিলাপের মধ্যে গণ্যকরতেন।’ (আহমাদ)
১৯. পুরুষদের জন্য শুধু মাত্র উপদেশ গ্রহণ এবং মৃতেরজন্য দু’আ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা সুন্নাত।এরশাদ হচ্ছে: “পূর্বে আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারতকরতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারতকরতে পার। কেননা তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথাস্মরণ করাবে।” (মুসলিম)
২০. তবে নারীরা অধিক হারে কবর যিয়ারত করবে না।কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক কবর যিয়ারতকারীনীদের লা’নত করেছেন। (সুনান গ্রন্থ)
২১. কবর যিয়ারতের সময় এই দু’আ পাঠ করবে:
السلام عليكم داَرَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِيْنَ وإناَّ إنْ شاَءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ نَسْأَلُ اللهَ لَناَ وَلَكُمُ الْعاَفِيَةَ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বওমিমমু’মিনীন। ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকূন।নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আ’ফিয়াহ।
অর্থ: “হে কবরের অধিবাসী মু’মিনগণ! আপনাদের প্রতিশান্তি ধারা বর্ষিত হোক নিশ্চয় আমরাও আপনাদের সাথে এসে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ্। আমরা আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’ (মুসলিম)
২২. মুসলিম ব্যক্তি কবর যিয়ারতে খুবই সতর্ক থাকবে।তা স্পর্শ করবে না, তাযীম করবে না, বরকত হাছিলের কারণ মনে করবে না, দু’আ চাইবে না। কেননা এগুলো শির্ক বা শির্কের মাধ্যম।
২৩. মৃতের পরিবারকে শোক বার্তা জানানোর সময় এইদু’আ করা সুন্নাত:
إنَّ ِللهِ ماَ أخَذَ وَلَهُ ماَ أعْطىَ وكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِأجَلٍ مُّسَمىَّ فاَصْبِرْ واَحْتَسِبْ
উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি মা আখাযা ওয়া লাহু মা আ’ত্বা।ওয়া কুল্লু শাইয়িন ’ইনদাহু বি আজালিম মুসাম্মা।ফাসবির ওয়াহতাসিব।
অর্থ: “তিনি যা নেন এবং দান করেন তার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।তাঁর নিকট প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দষ্ট সময় রয়েছে। তাই তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহর নিকট থেকে এর প্রতিদান প্রার্থনা কর।” (বুখারী ওমুসলিম)
২৪. মৃতের জন্য শুধু তিন দিন শোক পালন করা বৈধ।তবে মৃতের স্ত্রীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালনকরা ওয়াজিব, আর সে গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্তশোক পালন করবে।
২৫. মৃতের জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা, মাতম করা,কপোল চাপড়ানো, চুল, জামা-কাপড় ছেড়া ইত্যাদিসবই হারাম কাজ- যা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেকমুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।
পরিশেষে আল্লাহ তায়ালার বরগাহে দুয়া করি, হেআল্লাহ, মৃত্যু বরণ করার আগে তুমিআমাদেরকে পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান কর।আমীন।
No comments:
Post a Comment