আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

দৈনিক আজাদী
বুধবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ

তিনি ২১ জুলাই ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ ২৪ রজব ১৩২৯ হিজরি ৬ শ্রাবণ ১৩১৭ বাংলা শুক্রবার কুতুবদিয়া নিজ পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মহান পিতা হযরত হাফেজ সামশুদ্দীন (রহ.) বড় হাফেজ হুজুর নামে পরিচিতি ছিল। নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হেফ্‌জখানা। এতে আরাকান মায়ানমারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্ররা আসত পবিত্র কুরআন মজিদের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য। হযরত মালেক শাহ (রহ.)’র মাতা বেগম বদিউজ্জমাল (রহ.) তাপসী মহিলা ছিলেন। তাঁর পিতা কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ নিবাসী হযরত মাওলানা মঈন উদ্দীন অতি উচ্চমানের আলেম ছিলেন। হযরত বেগম বদিউজ্জমালের পবিত্র কুরআনের আয়াত অধিকাংশ মুখস্থ ছিল। পূর্ণ অর্থ ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন পারদর্শী। এলাকার মহিলাগণের কাছে তিনি ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন।
এই মহিমান্বিত দম্পতির মেধাবী সন্তান শাহ আবদুল মালেক আল-কুতুবী (রহ.) নিজে বর্ণনা দেন,“তখন আমি চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্‌রাসার আলিম জামাতের ছাত্র, ছুটিতে বাড়িতে আসি, শেষ রাতে যথারীতি তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে মোনাজাত করতে আমার কান্না এসে যায়। আব্বাজান কান্না শুনে আম্মাজানকে ডেকে বললেন, দেখ তোমার ছেলে অল্প বয়সে কি কান্ড করছে”। মা জবাব দিলেন,“যেমন বাপের তেমন ছেলে” তাতে অবাক হবার কি আছে? বাবা বললেন,“তাঁর মাও কম কিসের।”
তাঁর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ছমদিয়া মাদ্‌রাসা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্‌রাসায় ভর্তি হন। ঐ সময় তথা অল্প বয়সে সুলতানুল আউলিয়া হযরত হাফেজ মুনির উদ্দীন নুরুল্লাহ (রহ.)’র নিকট বায়াত লাভ করেন এবং পরবর্তীতে খেলাফত প্রাপ্ত হন। উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি ১৯৩৬/৩৭ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন হিন্দুস্থানের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্‌রাসায়। তিনি শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাঁশখালী ছনুয়া মাদ্‌রাসায় শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু। এরপর কিছু দিন ছমদিয়া মাদ্‌রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে পার্শ্ববর্তী লেমশীখালী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন দাদাজীর আজমগড়ী হযরতের নামে সামশুল উলুম হামেদিয়া মাদ্‌রাসা। দীর্ঘ ৯ বছর তিনি এ মাদ্‌রাসাটি পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন স্থানে সফর করতে থাকেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের পর তিনি কুতুবদিয়া নিজ বাড়িতে কুতুব শরীফ দরবার প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭৬-১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ তথা ১০ বছর কুতুব শরীফ দরবারে ৩ দিনব্যাপী সীরতুন্নবী (স.) মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। এতে দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ওলামা মাশায়েকগণ তকরীর পেশ করতেন। শুধু তাই নয়, দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ থেকে শুরু করে উচ্চস্তরের ব্যক্তিত্ববর্গ অংশ গ্রহণ করতেন।
এ মহান অলি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০০ খ্রিস্টাব্দ, ৭ ফাল্গুন ১৪০৭ বাংলা,১২ জিলক্বদ ১৪২১ হিজরি শনিবার চট্টগ্রাম মহানগরীতে ইন্তেকাল করেন।
হযরত মালেক শাহ (রহ.) দেশের বিভিন্ন অংশে অবস্থানের পর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে কুতুবদিয়াতে অবস্থান করতে থাকেন। তথায় সব সময় কম বেশি মানব সমাগম থাকত তাঁর সান্নিধ্য লাভের আশায়।
তাঁর জীবনে বহু করামত রয়েছে। তবে জীবনের শেষ করামত হল তাঁর ইন্তেকাল পরবর্তী জানাযা। তিনি তেমন সফর করতেন না। কুতুবদিয়াতে অবস্থান করতেন। সফর করলেও কদাচিৎ। কিন্তু চিকিৎসার তাগিদে তাঁকে চট্টগ্রাম মহানগরে আসতে হয় এবং চট্টগ্রাম শহরে ইন্তেকাল করেন। পরদিন সকাল নয় টায় বিশাল প্যারেড মাঠে তাঁর জানাযা। হযরত মালেক শাহ্‌ (রহ.) ফানাফিল্লাহ জগতে বিচরণ করায় তাঁর ভক্ত ছাড়া মুরিদ থাকার কথা নয়। তিনি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে কুতুবদিয়ায় অবস্থান করে আসছেন। তারপরেও প্যারেড মাঠে লক্ষাধিক লোকের সমাগমে জানাযা তাঁর জীবনের অন্যতম করামত বলে মনে করি।
মহান আল্লাহ পাক আমাকে আমার পীর গারাংগিয়ার হযরত বড় হুজুর (রহ.)’র ৪৩২ পৃষ্ঠাব্যাপী তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী গ্রন্থ লিখার সৌভাগ্য দান করেন। প্রায় বৎসরকাল ধরে তথ্য তালাশে আজমগড়ী সিলসিলার বহু দুর্লভ বিষয় জানার সৌভাগ্য হয়। তেমনিভাবে হযরত মালেক শাহ (রহ.)’র একাধিক করামত জানার সুযোগ হয়। তৎমধ্যে নিম্ন করামত পাঠক মহলে উপস্থাপন করলাম:-
আজমগড়ী হযরত (রহ.) উপমহাদেশ বিভাগের আগে ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলা হতে তথা তার নিজ বাড়ি হতে বৎসরে একবার চট্টগ্রাম সফর করতেন তরিক্বতে তাবলীগের উদ্দেশ্যে। তেমনি একবার তিনি তরিক্বতের তাবলীগে সফর করে রেলযোগে চট্টগ্রাম ত্যাগ করছিলেন। তখন হযরত মালেক শাহ (রহ.)’র যৌবনকাল বলে জানতে পারি।
রেল স্টেশনে হালিশহরের হাফেজ মুনির উদ্দীন (রহ.) গারাংগিয়ার বড় হুজুর (রহ.) সহ আজমগড়ী হযরত (রহ.)’র স্বনামধন্য খলিফাগণ থাকা স্বাভাবিক তাঁদের হযরত পীর সাহেবকে বিদায় জানানোর উদ্দেশ্যে। তেমনিভাবে আজমগড়ী সিলসিলার বহু মুরিদ ও অনুসারী ব্যক্তিবর্গও উপস্থিত থাকার কথা।
আজমগড়ী হযরত (রহ.) যথারীতি সকলের থেকে বিদায় নিয়ে ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে ট্রেনে আরোহণ করে তাঁর কক্ষে বসে পড়েন। অপরদিকে হযরত মালেক শাহ (রহ.) চট্টগ্রাম রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দ্রুতগতিতে পূর্ব-পশ্চিমে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন। আর বলতে থাকেন তাঁর মাতৃভাষায়,“তুই কেনে যাবি যা চাই,আঁরে কি দিবি দি যা।” অর্থাৎ আপনি কেমনে যাবেন যান দেখি,আমাকে কি দিবেন দিয়ে যান।
রেলের গার্ড সবুজ পতাকা দেখিয়ে ট্রেন ছাড়ার দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু চালক চেষ্টা করলেও ট্রেন চলে না। অপরদিকে,হযরত মালেক শাহ (রহ.) রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঐ একই কথা বারেবারে পুনরাবৃত্তি করে করে দ্রুত পায়চারি করতে থাকেন।
ট্রেন না চলার কারণ মহান আল্লাহ পাকের জিন্দা অলি আজমগড়ী হযরত (রহ.) না জানার কথা নয়। তিনি ট্রেনে তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ট্রেনের দরজায় দাঁড়ান এবং উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে বলেন,“মালেক কো পাকড়াও”। অর্থাৎ মালেককে ধরে নিয়ে আস। এখানে উল্লেখ্য আজমগড়ী হযরত (রহ.) তাঁর স্বনামধন্য খলিফাগণকে এক শব্দের নামে ডাকতেন। যেমন সালাম-হযরত আবদুস সালাম আরকানী (রহ.),মুনির-হালিশহরের হযরত হাফেজ মুনির উদ্দীন (রহ.), নজির- চুনতীর হযরত নজির আহমদ (রহ.),মজিদ- গারাংগিয়ার হযরত বড় হুজুর (রহ.),রশিদ- গারাংগিয়ার হযরত ছোট হুজুর (রহ.) ইত্যাদি।
তেমনিভাবে মালেক কো পাকড়াও বলার সাথে সাথে ৪/৫ জন যুবকশ্রেণির লোক দ্রুত গিয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারী করা অবস্থায় হযরত মালেক শাহ (রহ.) কে ধরে ফেলেন এবং টেনে টেনে আজমগড়ী হযরত(রহ.)’র ট্রেনের কক্ষের দরজায় নিয়ে আসেন। আজমগড়ী হযরত (রহ.) হযরত মালেক শাহ (রহ.)’র ঘাড়ে একটি থাপ্পড় মারেন। সাথে সাথে হযরত মালেক শাহ্‌ হুশহারা হয়ে প্ল্যাটফর্মে পড়ে যায়। তখন আজমগড়ী হযরত (রহ.) বললেন,“ড্রাইভারকো বোলো ট্রেন ছাড়নে কে লিয়ে”। অর্থাৎ ড্রাইভারকে বল ট্রেন ছাড়ার জন্য। সাথে সাথে ড্রাইভার ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যায়।
ছনুয়া মনুমিয়াজি জমিদার বাড়ির মরহুম মুহাম্মদ উল্লাহ মিয়া চৌধুরী আজমগড়ী হযরত (রহ.)’র অন্যতম মুরিদ ছিলেন। তিনি ৮৫ বছর বয়সে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। আজমগড়ী হযরত (রহ.) চট্টগ্রাম অঞ্চলে সফরকালে ছনুয়া মনু মিয়াজি বাড়িতে তশরীফ নিতেন। তথায় মাগরিবের নামাজান্তে আজমগড়ী হযরত (রহ.)’র পিছনে অনেকে মোরাকাবায় (ধ্যান) নিমগ্ন থাকাটা স্বাভাবিক।
উক্ত সময় হযরত মালেক শাহ (রহ.) ও অন্যান্যদের সাথে মোরাকাবায় বসে যান। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই তাঁর শরীরে আগুন ধরে যায়। সাথে সাথে তিনি দৌঁড়ে গিয়ে নিকটস্থ পুকুরে ঝাপিয়ে পড়েন।
মূলত হযরত মালেক শাহ (রহ.) ফানাফিল্লাহ জগতে বিচরণ করায় তাঁরই আপাদমস্তক অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্নতর হওয়া স্বাভাবিক।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে আজমগড়ী হযরত (রহ.) বার্ধক্যের চাপ উপেক্ষা করে সপ্তাহখানেকের প্রোগ্রাম নিয়ে শেষবারের মত দীর্ঘ ১৭ বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম সফর করেন আজমগড়ী সিলসিলার গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনার প্রয়োজনের তাগিদে। ঐ সময় কয়েকদিন তিনি হালিশহরে হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)’র বাড়িতে অবস্থান করেন। সে সময় হযরত মালেক শাহ (রহ.) তাঁর কয়েকজন ভক্তসহ হালিশহরে হাফেজ ছাহেব হুজুরের বাড়ির নিকটতম স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন।
হযরত মালেক শাহ্‌ (রহ.) প্রখ্যাত অলি হযরত হাফেজ মুনির উদ্দীন (রহ.)’র হাতে তরিক্বতে দাখিল হয়ে দ্রুত আধ্যাত্নিক সাগরে প্রবেশ করে ফানাফিল্লাহ জগতে পৌঁছে যান,যা কি না হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)’র মাধ্যমে আজমগড়ী হযরত (রহ.)’র নূরে নজর বলতে পারি।
বছরের যে কোন সময় তাঁর কবর শরীফে যেয়ারতকালীন দোয়া দরুদ পড়ে সওয়াব বকশিস করা যাবে। তাঁর উছিলা দিয়ে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে চাওয়া যাবে। কিন্তু তিনি ফানাফিল্লাহ জগতে থেকে ইন্তেকাল করায় তাঁর কবরে মোরাকাবা করা যাবে না। মহান আল্লাহপাক হযরত মালেক শাহ (রহ.) কে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন ॥
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলামিষ্ট