Monday, 16 September 2019

গারাংগিয়ার বড় হুজুর

বড় হুজুর কেবলা ও গারাংগিয়া মাদ্‌রাসা

বুধবার , ২৪ জুলাই, ২০১৯ @DainikAzadi

www.AhmadulIslamChowdhury.info

কুত্‌বুল আলম সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ সুফি আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ (রহ.)। বর্তমানকালে তিনি হযরত বড় হুজুর কেবলা নামে সমধিক পরিচিত। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে গারাংগিয়াস্থ নিজ বাড়ির নিকটে গারাংগিয়া মাদ্‌রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর পূর্বে চট্টগ্রাম মোহসেনিয়া মাদ্‌রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে হায়ার মাদ্‌রাসা (ফাজিল সমমান) অংশ গ্রহণ করে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। যা সেকালে প্রথম বিভাগ পাওয়াটা সহজ ছিল না। তার পূর্বে এ মোহসেনিয়া মাদ্‌রাসায় (বর্তমান হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) অধ্যয়নরত অবস্থায় সরকারিভাবে বৃত্তি লাভ করেন। শুধু তাই নয় সরকারিভাবে তাকে স্কলারশীপ সার্টিফিকেটও প্রদান করা হয়। মোহসেনিয়া মাদ্‌রাসার কৃতি ছাত্র বিধায় নিকটস্থ দারুল উলুম মাদরাসার শিক্ষকগণের আগ্রহে বিনা বেতনে খন্ডকালীন ক্লাস নিতেন।

কৃতিত্বের সাথে ফাজিল পাস করার পর পরিবারের বড় সন্তান বিধায় পুণ্যবতী মা চাচ্ছিলেন না আরও উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ভারতবর্ষের অন্যত্র যাক। এমনি অবস্থায় পার্শ্ববর্তী মির্জাখীলস্থ দরবার শরীফে ওস্তাদ হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা আবদুল হাই (রহ.) (প্রকাশ হযরত ছাহেব, ভারতবর্ষের প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব) পরামর্শ দেন মায়ের কথা যথাযথ। ভারতবর্ষের অন্যত্র না গিয়ে নিজ বাড়ির নিকটে একটি মাদ্‌রাসা প্রতিষ্ঠা করা ধর্মের জন্য নিজের জন্য কল্যাণকর হবে।
ফলে পুণ্যবতী আম্মাজান ও প্রখ্যাত ওস্তাদের পরামর্শ/ নির্দেশই ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে গারাংগিয়া মাদ্‌রাসার সূচনা হয়।

পরের বছর তথা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে চুনতীস্থ ইউসুফ মঞ্জিলে (হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা ইউসুফ আলী (রহ.) বাড়ি) আজমগড়ী হযরতের (হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান (রহ.) হাতে তরিক্বতে দাখিল হন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে আরকানী হযরত সহ আজমগড় নিজ পীরের দরবারে গমন করলে তাকে খেলাফত দানে ভূষিত করা হয়।

সেই ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে থেকে ইন্তেকাল পূর্ববর্তী পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর তাবলীগে তরিক্বতের খেদমতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন। অর্থাৎ গারাংগিয়া মাদ্‌রাসার খেদমতের পাশাপাশি উম্মতে মুহাম্মদীকে আধ্যাত্নিক জগতে আলোর পথ দেখাতে দেশে বিদেশে সফরের পর সফর করতে থাকেন। যা একালে ভাববার বিষয়। সেকালে প্রতিকূল যোগাযোগ সফরকালীন সাধারণের বাড়ি ঘরে অবস্থান, মানসম্পন্ন টয়লেটের অভাব, রান্নার প্রতিকূলতা সব কিছুকে উপেক্ষা করে তথা নীরবে খুশি মনে নিয়ে তরিক্বতের খেদমত করে গেছেন।

সেই ১৯৫০ এর দশক থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত দেশের এ অঞ্চলে সর্ব মহলে সর্ব আকিদার ধর্মীয় ব্যক্তিগণের কাছে তাঁর প্রতি সম্মান একালে ভাবতে হবে। তিনি গারাংগিয়া মাদ্‌রাসা প্রধান হিসেবে সেই ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৭০ এর দশকের শুরু পর্যন্ত মাদ্‌রাসা প্রধানের পদবী হিসেবে সর্বমহলে সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছাহেব হুজুর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিওবা ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি তরিক্বতের হক্কানী পীর হিসেবে খেদমতে নিয়োজিত,তথাপি সর্ব মহলে সর্ব আকিদা পন্থিগণের নিকট তিনি সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছাহেব হুজুর হিসেবে পরিচিত হন। ১৯৭০ এর দশকের শুরু থেকে তিনি হযরত বড় হুজুর কেবলা হিসেবে এবং সাথে সাথে তার সহোদর ছোট ভাই কুত্‌বে মাদার শায়খুত তরিক্বত আলহাজ্ব শাহ সুফি হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রশিদ হামেদী ছিদ্দিকীকে ছোট হুজুর কেবলা লকবে সম্বোধন হয়ে আসছে।

গারাংগিয়া মাদ্‌রাসা দেশ পেরিয়ে আন্তর্জান্তিক মন্ডলে একটি পরিচিত নাম। এখান থেকে হাজার হাজার আলেমেদ্বীন কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা জীবন শেষ করে, যা একালে সাধারণের ভাবিয়ে তুলে। এমন হক্কানী তরিক্বতের শেখ তথা আল্লাহর অলি অর্থাৎ তাকওয়া পরহেজগারী ওয়ালা আলেম এ মাদ্‌রাসা থেকে লেখাপড়া সমাপ্ত করে বাস্তব জীবনে পা বাড়ায়। গারাংগিয়া তরিক্বত সিলসিলা সম্পূর্ণ শরীয়তভিত্তিক হক্কানী তরিক্বত। যার ফলে সর্ব আকিদা পন্থির কাছে গারাংগিয়ার প্রতি আলাদা সম্মানবোধ রয়েছে। এ মহান অলি তথা হযরত বড় হুজুর কেবলা ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ২১ অক্টোবর ৭ জিলকদ ১৯৩৭ হিজরী ৪ কার্তিক ১৩৮৪ বাংলা শুক্রবার সকালে গারাংগিয়াস্থ নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন)। ইন্তেকালের সময় হুজুরের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। এ দিন বাদ আছর তাঁর স্নেহের ছোট ভাই হযরত ছোট হুজুর কেবলার ইমামতিতে নামাজে জানাযার পর গারাংগিয়া মাদ্‌রাসা মসজিদ সংলগ্ন দাফন করা হয়।

১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মোবাইল ত ছিলই না ল্যান্ড টেলিফোনের সীমাবদ্ধ ছিল। ঐ সময় হযরত বড় হুজুর কেবলার ইন্তেকালের সংবাদ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। সকাল ৯ টা বা ১০ টার মধ্যে মুরীদগণ মাইক বের করে ইন্তেকালের সংবাদ প্রচার করতে থাকেন।

দুপুরের দিকে গারাংগিয়ার পানে মানব ঢল শুরু হয়। কে কোন দিক দিয়ে গারাংগিয়া আসছে তার ইয়ত্তা নেই। দুপুর থেকে গারাংগিয়ায় সমাগম বাড়তে থাকে। এ সমাগম জন সমুদ্রে রূপ লাভ করে। গারাংগিয়া মাদ্‌রাসার ময়দান, মাদ্‌রাসার দালানাদি, রাস্তা, বাড়ি ঘরের উঠান, ডলু খালের বালির চর, ডলু খালের পূর্ব পার্শ্বের রাস্তা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জন সমুদ্রের এ জানাযায় কত জিন্নাত, কত ফেরেশতা, কত মানব যোগদান করেছেন তার হিসাব মহান আল্লাহপাকের কাছে।
তাঁর মহান পীর আজমগড়ী হযরত বলে গেছেন,“ মেরে মজিদ কা খীমা ওয়াসী, নজর আতা হে”। আজমগড়ী হযরত আরও বলে গেছেন,“ বাঙ্গাল মে কুই মুখলেছ হেত মজিদ হে”। অর্থাৎ গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুর কেবলা শরীয়ত ও তরিক্বতের বিশালত্ব দেখতেছেন বলে তাঁরই পীর ছাহেব আজমগড়ী হযরত এ বাক্য গুলো বলেছিলেন।
উল্লেখ্য আজমগড়ী হযরত তাঁর মহান খলিফাগণকে এক শব্দের নামে ডাকতেন। যেমন-হযরত শাহ মাওলানা আবদুস ছালাম আরকানী (রহ)’কে ‘ছালাম’, হযরত শাহ হাফেজ মুনীর উদ্দিন হালিশহর (রহ)’কে ‘মুনীর’, হযরত শাহ মাওলানা নজির আহমদ চুনতী (রহ.)কে ‘নজির’, হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মজিদ (রহ.) গারাংগিয়া বড় হুজুর (রহ.)কে ‘ মজিদ’ বলে সম্বোধন করতেন।

বাস্তবই গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুর কেবলা শরীয়ত কেন্দ্রীক তরিক্বতের বিশাল আনজাম ভাববার বিষয়। তাঁর সৃষ্ট অসংখ্য অতি উঁচুমানের আলেম, মুফতি, মুহাদ্দেস, সুফি, দরবেশ রেখে গেছেন, আরও রেখে গেছেন লক্ষ লক্ষ মুরিদ। তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরিদগণের মধ্যে শতকরা ৯০ জনের অধিক ইন্তেকাল হয়ে গেছেন। যারা বেঁচে আছেন তারাও বার্ধক্যে জীবনের শেষ প্রান্তে। তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরিদগণের মধ্যে শতে একজনও আছে বলে মনে হবে না, যারা দৈনিক তিন বেলা ফজর,মাগরিব ও এশার নামাজের পর পর তরিক্বতের অজিফা পড়তে অবহেলা করেছেন বা করতেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত বড় হুজুর কেবলা বলে গেছেন তরিক্বতে দাখিল হলে দৈনন্দিন ৩ বেলা নামাজের পর পর তরিক্বতের অজিফা পড়া বাধ্যতামূলক। অলসতা,অবহেলা করলে গরীব হয়ে যেতে পারে। পাগল হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বস্তুত গারাংগিয়া তথা আজমগড়ী সিলসিলায় তরিক্বতে দাখিল হয়ে দৈনন্দিন অজিফা পড়া বাধ্যতামূলক। শতের মত দাখিল থেকে কামিল পর্যন্ত বড় মাদ্‌রাসা বাদেও তাঁর ওসিলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত কত মসজিদ, ফোরকানিয়া, খানকাহ, এতিমখানা ও হেফজখানা রয়েছে যা গণনা করে নির্ণয় করা সহজসাধ্য নয়। শুধু তাই নয়, হযরত বড় হুজুর কেবলার এত বেশি কারামত (কারামত/কেরমাত) রয়েছে যে, এই নিয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করা যাবে। তারপরও তাঁর মোবারক জীবনের উপর রচিত গ্রন্থের শেষের দিকে বিচ্ছিন্ন কিছু কারামত সংযোজিত করা আছে।

No comments:

Post a Comment

معني اللغوي الاستوي

  1.اللغوي السلفي الأديب أبو عبد الرحمن عبد الله بن يحيى بن المبارك [ت237هـ]، كان عارفا باللغة والنحو، قال في كتابه "غريب ...