মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী মঃজিঃআঃ, মুহতরাম হুজুরের এই জজবাপূর্ণ ফাতাওয়াবাজি সম্পর্কে বেশ কয়েকজন বন্ধু ও ছোট ভাই আমার কাছে জানতে চেয়েছেলেন। তাছাড়া এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থী ভাই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক ইসলামী চিন্তাবিদ হুজুর সাইয়্যেদী শাইখুল ইসলাম প্রফেসর আল্লামা ড. মুহাম্মদ তাহিরুল ক্বাদেরী (হাফিজাহুল্লাহ্)-সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেও দেখা যাচ্ছে....
😢
সকলের উদ্দেশ্যে সবিনয়ে অনুরোধ করবো যে, কুফরীর ফাতাওয়া বিষয়ে ধারণা পাওয়ার জন্য আগে নিম্নোক্ত লেখাটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন (আমি কোন মুফতি নই। পবিত্র কুরআন, হাদীছ এবং মুহাক্কিক ফোকাহায়ে কেরামের কিতাবে যা লেখা আছে তা তুলে ধরেছি মাত্র।)। অতঃপর এই হুজুরের পুরো জীবন কর্মের সাথে সাইয়্যেদী শাইখুল ইসলাম (حفظه الله)-র জীবন কর্ম মিলিয়ে দেখুন। আশা করি আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।
কুফরীর ফাতাওয়া: পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং মুহাক্কিক ফোকাহায়ে কেরামের অভিমতের আলোকে একটি পর্যালোচনা।
=============================
আজকাল আমাদের সমাজে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, কারো সাথে কারো কোনো বিষয়ে মতানৈক্য কিংবা বিরোধ দেখা দিলেই তাকে যেকোনো উপায়ে ঘায়েল করার প্রাণপণ চেষ্টা করা হয় এবং এতে সফল হওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম কৌশল হলো- প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুফরীর ফাতাওয়া তৈরি করে তাকে কাফির ঘোষণা করা। এ জঘন্য কাজটি আলেম সমাজের মধ্যেই প্রচলিত। এ ক্ষেত্রে তাঁদের খুব বেশি বেপরোয়াই দেখা যায়। এমনকি আজকাল শুধু আলেম না, বিভিন্ন অশিক্ষিত ওয়ায়েজদের মধ্যেও এ প্রবণতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁরা এই ধরনের ফাতাওয়া প্রকাশ্যে বড় বড় কনফারেন্সে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচার করে থাকেন। যার ফলে চলমান অনৈক্য শুধু তাঁদের (আলেম) নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। ফলে তারা বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে একে অপরের সাথে গালিগালাজ, মারামারি এমনকি খুনাখুনিতে পর্যন্ত লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যার সংবাদ আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত পেয়ে থাকি। সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণনা এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে, যখন মানুষ মূর্খ লোকদের (ধর্মীয়) ইমাম কিংবা নেতা বানাবে, অতঃপর তাদের নিকট দ্বীনি বিষয়ে ফাতাওয়া জিজ্ঞেস করবে। অতঃপর তারা ফাতাওয়া দানের বিষয়টি না জেনে (বা যথাযথভাবে বিচার-বিবেচনা না করে) ফাতাওয়া দিবে। ফলে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং সাধারণ মানুষদেরও পথভ্রষ্ট করবে।(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং-১০০) কারণ, তারা (সাধারণ মানুষ) বড় বড় জোব্বা কোব্বা পরিহিত কিংবা মাদ্রাসার হুজুর মাত্রই বড় মুফতী মনে করে। একবার ইমাম হাসান আল-বসরী (রা:)'র নিকট এক ব্যক্তি বলেছিল যে,
إن فقهاءنا يقولون كذا
" আমাদের ফকীহগণ এ রকম বলে থাকেন।"
তখন তিনি লোকটিকে বলেছিলেন,
وهل رأيت فقيها قط؟ انما الفقيه: الزاهد في الدنيا، الراغب في الآخرة، البصير بدينه، المداوم على عبادة ربه.
" তুমি কি কখনো ফকীহ দেখেছো? ফকীহ তো শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি, যে পার্থিব ভোগবিলাসের প্রতি অমনোযোগী, পরকালের প্রতি বেশি মনোযোগী, তাঁর দ্বীন বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং তাঁর প্রভুর ইবাদতে নিয়মিতভাবে লিপ্ত।"(আবুল লাইছ আস্ সমরকন্দী, তানবীহুল গা'ফেলীন, পৃ.২৮৭)
প্রিয় নবীজি (ﷺ) বলেন,
من يرد الله به خيرا يفقهه في الدين.
" মহান আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাঁকে দ্বীনের বুঝশক্তি দান করেন। অর্থাৎ ফকীহ হওয়ার তাওফীক দান করেন।"(সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম)
বর্তমান সময়ের এই করুণ অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, আজকালকার নীতিহীন, পার্থিব স্বার্থান্বেষী ও সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে বেখবর মুফতীদের ফাতাওয়ার গ্রহণযোগ্যতা কুরআন, হাদীছ এবং সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে কতটুকু, তা যথাসম্ভব সাধারণ ধর্মপ্রাণ ভাইদের জন্য উপস্থাপন করবো, যার মাধ্যমে তারা প্রচলিত কাদাছোড়াছুড়ি আর ফাতাওয়াবাজির স্বরূপ বিষয়ে জানতে পারবেন।
স্বার্থান্বেষী মুফতীদের প্রতারণার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে নীল নদের কবি হাফিজ ইব্রাহিম বলেন-
وفقيه قوم ظل يرصد فقهه ... لمكيدة أو مستحل طلاق
يمشي وقد نصبت عليه عمامة ... كالبرج لكن فوق تل نفاق
يدعونه عند الشقاق وما دروا ... أن الذي يدعون خدن شقاق.
"জাতির ফকীহরা ফিকহকে ষড়যন্ত্র কিংবা তালাক হালালের ফাঁদে পরিণত করেছে।
তারা মাথায় সুউচ্চ মিনারের মতো পাগড়ি পরে চলাফেরা করে, অথচ তার চূড়ার নীচে রয়েছে কপটতা।
বিরোধের সময় লোকেরা তাদেরকে ডাকে; অথচ তারা জানে না যে, যাদেরকে তারা ডাকলো, তারাই নেপথ্যে সকল বিরোধের নায়ক।"
এখানে শুধু কুরআনের আয়াত, হাদীছ এবং উম্মাহর উজ্জ্বল নক্ষত্রতুল্য মুহাক্কিক ফোকাহায়ে কেরামের অভিমতই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যেমন,
#ফাতাওয়া_দানে_মুহাক্কিক_ওলামায়ে_কেরামের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন:
--------------------------------------------------------------------
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন ও পূর্ববর্তী মুহাক্কিক ওলামায়ে কেরাম ফাতাওয়া দানে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং যথাসম্ভব ফাতাওয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতেন। কোনো বিষয় সুস্পষ্টভাবে জানা না থাকলে " জানি না" বলে উত্তর দিতেন। যেমন,
১). একদা ইমাম শা'বী (রা:)'র একটি বিষয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, " আমি জানি না"। তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, আপনার এই " আমি জানি না" বলাতে লজ্জাবোধ হয়নি, অথচ আপনি ইরাকবাসীদের ফকীহ?! উত্তরে তিনি বলছিলেন, ফেরেস্তাগণও আল্লাহর সামনে (سُبْحَانَكَ لاَ عِلْمَ لَنَا إِلاَّ مَا عَلَّمْتَنَا) বলার সময় লজ্জাবোধ করেননি।
২). ইমাম নববী (রা:) বলেন, ইমাম হাসান বসরী, ইমাম শা'বী প্রমুখ তাবেঈগণ বলেছেন,
إن أحدكم ليفتي في المسألة ولو وردت على عمر بن الخطاب رضي الله عنه لجمع لها أهل بدر.
" তোমাদের যে কেউ তো যেকোনো মাস'আলায় ফাতাওয়া দিতে চাও। অথচ হযরত ওমর (রা:)'র নিকট যখন কোন মাস'আলা উপস্থাপিত হতো, তখন তিনি নিজে উত্তর না দিয়ে এর জন্য বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণকে একত্রিত করতেন।( যেন তাঁরাই মাস'আলাটির উত্তর প্রদান করেন)" (আদাবুল ফাতাওয়া, পৃ.১৬)
৩). জলীলুল ক্বদর তাবেয়ী হযরত আব্দুর রহমান বিন আবী লাইলা (রাহ:) বলেন,
أدركت عشرين ومائة من أصحاب رسول الله ﷺ ما كان منهم محدث إلا ود أن أخاه كفاه الحديث، ولا مفت إلا ود أن أخاه كفاه الفتيا.
" আমি রাসূল কারীম (ﷺ)'র একশ বিশ জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছি; কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউ হাদীছ বর্ণনা করতে চাইতেন না। তাঁরা প্রত্যেকেই কামনা করতেন যে, তাঁর অপর ভাইয়ের হাদীছ বর্ণনা তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে। অনুরূপভাবে তাঁদের কেউ ফাতাওয়া দিতে চাইতেন না। তবে তাঁরা প্রত্যেকেই কামনা করতেন যে, তাঁর অপর ভাইয়ের ফাতাওয়া তার জন্য যথেষ্ট হবে।( ইবনে আব্দিল বার, জামে বয়ানিল ইলম..., পৃ.৪১)
৪). মদীনা শরীফের বিশিষ্ট শাইখ আবু ইসহাক (রাহ:) বলেন,
كنت اري الرجل في ذالك الزمان، وانه ليدخل يسال الناس عن الشئ، فيدفعه الناس من مجلس الي مجلس حتي يدفع الي مجلس سعيد بن المسيب كراهية للفتوى، قال: وكانوا يدعون سعيد بن المسيب: الجريء.
" আমি ঐ যুগে লোকদের (তাবেয়ীন) দেখতাম যে, যখন তাঁদের নিকট কেউ কোনো প্রশ্ন নিয়ে আসতো, তখন তারা তাকে এক মজলিস থেকে অন্য মজলিসে পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে অবশেষে তাঁরা তাকে মদীনার বিশিষ্ট ফকীহ হযরত সাঈদ বিন আল-মুসাইয়্যিব (রা:)'র নিকট পাঠাতেন। এর কারণ ছিল, তাঁরা নিজেরা ফাতাওয়া দিতে পছন্দ করতেন না। তিনি বলেন, তাঁরা এর জন্য (ফাতাওয়া দিতে সাহস করার জন্য) সাঈদ বিন আল-মুসাইয়্যিব (রা:)কে সাহসী বলে ডাকতেন।( ইবনে আব্দিল বার, জামে বয়ানিল ইলম...., পৃ.৪৫২)
৪). হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন,
إن كل من أفتى الناس في كل ما يسألونه عنه لمجنون.
" যে ব্যক্তি লোকদের জিজ্ঞাসিত সকল বিষয়ে ফাতাওয়া দেবে, সে পাগল।"(ইবনে আব্দিল বার, জামে বয়ানিল ইলম..., দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বাইরুত, পৃ. ৪৫২)
৫). সহীহ মুসলিম শরীফের মুকাদ্দিমায় বর্ণিত আছে, একবার কিছু লোক হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:)'র জনৈক পুত্র থেকে এমন একটি মাস'আলা সম্পর্কে জানতে চাইলো, যে বিষয়ে তাঁর নিকট যথাযথ জ্ঞান ছিল না। তখন ইয়াহিয়া বিন সাঈদ (রা:) তাঁকে বললেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لأُعْظِمُ أَنْ يَكُونَ مِثْلُكَ وَأَنْتَ ابْنُ إِمَامَيِ الْهُدَى- يَعْنِي عُمَرَ وَابْنَ عُمَرَ- تُسْأَلُ عَنْ أَمْرٍ لَيْسَ عِنْدَكَ فِيهِ عِلْمٌ.
" আল্লাহর কসম! এ কেমন করে সম্ভব?! এ তো রীতিমতো আশ্চর্যের ব্যাপার! কারণ, আপনি হলেন হেদায়তের দুজন ইমামের সন্তান। অর্থাৎ হযরত ওমর ফারুক এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:)'র সন্তান। আপনার নিকট একটি মাস'আলা জিজ্ঞেস করা হলো, অথচ আপনার নিকট এ সম্পর্কে জ্ঞান নেই!
অতঃপর জবাবে তিনি বললেন,
فَقَالَ أَعْظَمُ مِنْ ذَلِكَ وَاللَّهِ عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ مَنْ عَقَلَ عَنِ اللَّهِ أَنْ أَقُولَ بِغَيْرِ عِلْمٍ أَوْ أُخْبِرَ عَنْ غَيْرِ ثِقَةٍ.
" আল্লাহর কসম! আল্লাহর নিকট এবং তাঁর জ্ঞানী বান্দাদের নিকট এর চেয়েও বড় জঘন্য ব্যপার হলো- আমি যথাযথ জ্ঞান ছাড়া কোনো মত প্রকাশ করবো কিংবা অবিশ্বস্ত লোকদের নিকট শুনে কিছু বর্ণনা করবো।
৭) ইমাম আজম ইমাম আবু হানিফা (রা:) বলেন,
لو لا الفرق من الله أن يضيع العلم ما افتيت احدا، يكون له المهنأ وعلي الوزر.
" যদি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ইলম বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা না হতো, তাহলে আমি কাউকে ফাতাওয়া প্রদান করতাম না। কেননা প্রশ্নকারীরা বিনা পরিশ্রমে উত্তর পেয়ে গেলেও উত্তর প্রদানের দায়ভার আমার উপরই রয়ে যায়।( ইমাম, নাববী, শরহুল মুহাযযাব, খ.১, পৃ.৪০,৪১)
৮). হযরত হাইছাম ইবনে জামিল (রাহ:) বলেন,
شهدت مالكا سئل عن ثمان واربعين مسألة، فقال في ثنتين وثلاثين منها: لا ادري
আমি ইমাম মালেক (রাহ:)কে দেখেছি যে, তাঁকে চল্লিশটি মাস'আলা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তন্মধ্যে তিনি বত্রিশটি মাস'আলায় বলেছিলেন, لا ادري অর্থাৎ "আমি জানি না"।(নাবাবী, আদাবুল ফাতাওয়া, পৃ.১৫)
৯). একবার ইমাম শাফেয়ী (রাহ:)কে একটি মাস'আলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন নি। অতঃপর তাঁর কাছে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
حتى لا ادري أن الفضل في السكوت أو في الجواب.
" আমি যখন জানবো যে, কল্যাণ উত্তর দেওয়ার মধ্যে না কি চুপ থাকার মধ্যে নিহিত, তখনই উত্তর দেবো।"(নাবাবী, আদাবুল ফাতাওয়া, পৃ.১৫)
তিনি তাঁর উস্তাদ সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ (রা:) সম্পর্কে বলেন,
ما رأيت أحدا جمع الله فيه من الة الفتيا ما جمع في ابن عيينة، اسكت منه على الفتيا.
"হযরত ইবনে উয়াইনা (রা:)'র মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ফাতাওয়া দানের যে দক্ষতা একত্রিত করেছেন, তা অন্য কারো মধ্যে দেখিনি। ফাতাওয়া দানে তাঁর চেয়ে বেশি চুপ থাকতেও কাউকে দেখিনি।"(নাবাবী, আদাবুল ফাতাওয়া, পৃ.১৬)
১০). ইমাল আল-আছরাম (রাহ:) বলেন,
سمعت احمد بن حنبل يكثر أن يقول لا ادري.
" আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহ:)কে ( মাস'আলা সংক্রান্ত) অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তরে لا ادري অর্থাৎ " আমি জানি না"। বলতে শুনেছি।(নাবাবী, আদাবুল ফাতাওয়া, পৃ.১৫)
সম্মানিত পাঠক বন্ধুগণ, এবার চিন্তা করে দেখুন যে, ফাতাওয়া দানের ব্যপারে আজকালকার মৌলভী সমাজের সাথে আমাদের মুজতাহীদ ইমামগণের পার্থক্য কতটুকু?! আরো চিন্তা করুন যে, উল্লেখিত ইমামগণের লিখিত কিতাবগুলো ভালোভাবে বুঝা তো দূরের কথা, পড়ার যোগ্যতাও তাদের (এখনকার ফাতাওয়াবিদ) অনেকে রাখেন কি না?!
#কোনো_মুসলমানের_উপর_কুফরীর_ফাতাওয়া আরোপ করার বিষয়ে পবিত্র কুরআন, হাদীছ এবং সত্যনিষ্ঠ ফকীহগণের অভিমত:
----------------------------------------------------------------------------
এ বিষয়টি জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম যারা মুসলমানদের (সাহাবায়ে কেরাম) কাফির বলে ফাতাওয়া আরোপ করেছিল, তারা খারেজী সম্প্রদায়, কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম ঐ ভ্রান্ত সম্প্রদায়কেও তাদের মতো করে কাফির বলতেন না। অথচ তাদের বিষয়ে মহানবী (ﷺ) বলেছেন,
الخوارج كلاب النار
"খারেজিরা জাহান্নামের কুকুর"(সুনানু ইবনে মাজাহ, মুকাদ্দিমা, হাদীছ নং-১৭৮)
#আল_কুরআনুল_কারীম:
-----------------------------------
কোনো মুসলমান বা মুসলমানের নিদর্শন পাওয়া যায় এমন কাউকে কাফির ঘোষণার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَىٰ إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا
(হে মুমিনগণ!) আর যে তোমাদেরকে সালাম দেয়, তাকে তোমরা এ কথা বলো না যে, তুমি মু'মিন না।(সূরা-নিসা, আয়াত:৯৪)
#আল_আহাদীছুন_নাবভিয়্যাহ:
----------------------------------------
১). কোনো মুসলমানকে কাফির বলতে গিয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ স্বরূপ রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
أَيُّما امْرِئٍ قالَ لأَخِيهِ: يا كافِرُ، فقَدْ باءَ بها أحَدُهُما، إنْ كانَ كما قالَ، وإلّا رَجَعَتْ عليه.
" কোনো ব্যক্তি তাঁর ভাইকে (অন্য মুসলিমকে) 'কাফির' বলে সম্বোধন করলে তাদের দুজনের যেকোনো একজন তার সম্মুখীন হবে (যোগ্য হবে)। যাকে 'কাফির' বলা হয়েছে সে যদি প্রকৃতপক্ষে কাফির হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আর যদি সে কাফির না হয়, তাহলে আহ্বানকারী নিজেই এ সম্বোধনের উপযোগী হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং-২২৫)
২). অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهْوَ كَقَتْلِهِ
"আর যে ব্যক্তি কোনো মু'মিনের প্রতি কুফরীর অভিযোগ করলো, সে যেন প্রকারান্তরে যেন তাকে হত্যা করল।"(সহীহ বুখারী, হাদীছ নং-৬১০৫)
৩). অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
من دعا رجلًا بالكفرِ، أو قال: عدوُّ اللهِ، وليس كذلك إلا حارَتْ عليه
" যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে সম্বোধন করল অথবা বললো আল্লাহর শত্রু, অথচ সে ব্যক্তি বাস্তবিকপক্ষে তা নয়, তাহলে উক্ত বাক্য সম্বোধনকারীর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।(সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং-২২৬)
৪). অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
ثلاثٌ من أصلِ الإيمانِ الكفُّ عن من قال لا إلهَ إلّا اللهُ ولا نكفِّرْه بذنبٍ ولا نُخرجْه من الإسلامِ بعملٍ......
" তিনটি বিষয় মূল ইমানের অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো হল- যে ব্যক্তি "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর ঘোষণা দেবে, আমরা(যুদ্ধক্ষেত্রে) তাকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবো, গোনাহের কারণে আমরা তাকে কাফির বলবো না এবং কোনো আমালের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবো না। (সুনানু আবী দাউদ, হাদীছ নং-২৫৩৪)
#সত্যনিষ্ঠ_ফকীহগণের_অভিমত:
--------------------------------------------
আমাদের মহান মুজতাহিদীন ও ফোকাহায়ে কেরাম কারো উপর কুফরীর ফাতাওয়া আরোপ করার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। যেমন,
*** ইমাম আবু জাফর আত্ ত্বাহাভী (রা:) হানাফী ইমামগণ থেকে বর্ণনা করেন,
لا يخرج الرجل من الايمان الا جحود ما ادخله فيه.
"কোনো ব্যক্তি যে সকল বিষয় স্বীকার করার মাধ্যমে ইমানদার হয়েছে, সে সকল বিষয় অস্বীকার করা ব্যতীত অন্য কোনো কারণ তাকে ইমান থেকে বাহির করবে না তথা কাফির হবে না।"
অতঃপর অস্বীকারকৃত বিষয়ের যথাযথ প্রমাণ সাব্যস্ত করণ সম্পর্কে আলেমগণের অভিমত বর্ণনায় ইমাম ত্বাহাভী (রা:) বলেন,
ثم ما تيقن انه ردة يحكم بها، وما يشك أنه ردة لا يحكم بها،
"অতঃপর যখন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ম ত্যাগ করেছে, তাহলে তার উপর কুফরীর ফাতাওয়া আরোপ করা যাবে। আর যদি এক্ষেত্রে (কুফরী প্রমাণের) কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ থাকে, তাহলে তার উপর কুফরীর ফাতাওয়া আরোপ করা যাবে না।" এর কারণ বর্ণনায় তিনি বলেন,
اذ الاسلام ثابت لا يزول بالشك.
"যখন কারো মধ্যে ইসলাম সাব্যস্ত হয় অর্থাৎ যখন কেউ মুসলমান বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, তখন তা সন্দেহমূলক বিষয়ের দ্বারা দূরীভূত হয় না।"
*** এক্ষেত্রে মুফতী বা আলেমদের উদ্দেশ্য আমাদের মাজহাবের ইমামগণের নির্দেশনা বর্ণনায় ইমাম ত্বাহাভী (রা:) বলেন,
وينبغي للعالم إذا رفع إليه هذا أن لا يبادر بتكفير أهل الاسلام.
"আর আলেমের (ফাতাওয়াদানকারী মুফতীর) উচিত, যখন তাঁর কাছে এই ধরনের বিষয় (কুফরীর মাস'আলা) উপস্থাপন করা হবে, তখন তিনি যেন কোনো মুসলমানকে কাফির বলে ফাতাওয়া দিতে গিয়ে তাড়াহুড়া না করেন।"(ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮)
*** ফাতাওয়া তাতারখানিয়ার বরাতে রদ্দুল মুখতার (ফাতাওয়া শামী) প্রণেতা আল্লামা ইবনে আবেদীন (রা:) বলেন,
لا يكفر بالمحتمل.
"কোনো সম্ভাবনাময় বিষয়ের কারণে কাউকে কাফির ঘোষণা করা যাবে না।"(রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮)
*** এ বিষয়ে প্রায় সকল ফকীহ'র অভিমত হলো-
إذا كان في المسألة وجوه توجب التكفير، ووجه واحد يمنعه، فعلى المفتي أن يميل إلى الوجه الذي يمنع التكفير تحسينًا للظن بالمسلم.
" যদি মাস'আলায় কাউকে কাফির ঘোষণা করার বহু উপলক্ষ পাওয়া যায় এবং শুধুমাত্র একটি উপলক্ষ এমন পাওয়া যায় যার উপর ভিত্তি করে কাফির বলা যাবে না, তাহলে মুফতীর জন্য আবশ্যক যে, মুসলমানের প্রতি সুধারণা পোষণ করত সে-ই (কাফির না হওয়ার) উপলক্ষকেই গ্রহণ করা।" (ইবনে নুজাইম রা., আল-বাহরুর্ রা'য়েক শরহু কানযূদ্ দাক্বায়েক, কিতাবুস্ সিয়ার, বাবু আহকামিল মুরতাদ, খ.৫, পৃ.১৩৫, ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮)
*** জামেউল ফুসূলাইন এবং আল-ফাতাওয়া আস্ সুগরা এর রেফারেন্সে আল্লামা ইবনে আবেদীন (রা:) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কিতাব রদ্দুল মুখতারে (ফাতাওয়া শামী) উল্লেখ করেন,
الكفر شيء عظيم، فلا أجعل المؤمن كافرا متى وجدت رواية انه لا يكفر.
" কাউকে কাফির ঘোষণা করা অনেক বড় বিষয়। তাই আমি যতক্ষণ কুফরী সাব্যস্ত না হওয়া বিষয়ে একটি বর্ণনাও পাবো, ততক্ষণ কখনো কোনো মু'মিনকে কাফির বানাবো না।(ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮)
*** এ বিষয়ে ইমাম আবু হামেদ আল-গাযালী (রা:) আলেমদের প্রতি অসিয়্যত স্বরূপ বলেন,
اما الوصية، فان تكف لسانك عن أهل القبلة ما امكنك ما داموا قائلين : لا اله إلا الله محمد الرسول الله.
" অতঃপর অসিয়্যত হল- তুমি যথাসম্ভব মুসলিমকে কাফির বলা থেকে নিজের জিহ্বাকে বিরত রাখবে, যে যাবৎ তারা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্" বলবে (ততক্ষণ)।
" (গাযালী রা. ফাইসালুত্ তাফরিকা বাইনাল কুফরী ওয়ায্ যিনদিক্বাহ, পৃ.১৯৫)
#যে_সকল_কারণে_কাউকে_কাফির_ঘোষণা_করা_যাবে:
-----------------------------------------------------------------------
ওলামায়ে কেরাম বলেন,
* যদি কেউ আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল কারীম (ﷺ)কে অস্বীকার করে, (নাঊযূবিল্লাহ্)
* তাঁর দোষ তালাশের চেষ্টা করে,
* তাঁর কোনো সুন্নাতকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে,
* কুর'আন-সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত কোনো বিধানকে মানবতাবিরোধী বলে কিংবা অস্বীকার করে,
* সৃষ্টির মধ্যে কাউকে তাঁর চেয়ে বড় জ্ঞানী বলে,
* ইসলামের কোনো একটি মৌলিক বিষয় যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি... অস্বীকার করে, তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এবং কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণপূর্বক কুফরীর পর্যায়ে পড়ে না বলে মনে করার উপায়ও না থাকে, তাহলে তাকে কাফির বলা যাবে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন,
*** আল্লামা কাযী আয়ায (রাহ:)'র "আশ্ শিফা বিতা'রীফি হুকুকিল মুস্তাফা (ﷺ)",
*** আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ (রাহ:)'র "আস্ সা'রিমুল মাসলূল আলা শা'তিমির্ রাসূল (ﷺ)",
*** আল্লামা ইবনে আবেদীন (রাহ:)'র "তানবীহুল ওয়ালা'ত ওয়াল হুক্কাম আলা শা'তিমি খাইরিল আনাম(ﷺ) ওয়া আহাদি আসহাবিহিল কিরাম (রা:)" এবং
*** শাইখুল ইসলাম প্রফেসর আল্লামা ড. মুহাম্মদ তাহিরুল ক্বাদেরী (حفظه الله)'র "তাহাফ্ফুজে না'মূসে রিসালাত"।
মুহাম্মদ আবদুল আজিজ
২১.০১.২০২০
اللهم اجعلنا من عبادك المخلصين بحق عبدك الأعبد محمد الرسول النبي الأمي الامين المكين الحنين الكريم الرؤف الرحيم عليه وعلى اله أفضل الصلاة والتسليم.
No comments:
Post a Comment